দেশের বাজারে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনহীন ওষুধের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফার্মেসি, ওষুধের গুদাম এবং কিছু হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারেও এসব ওষুধের উপস্থিতি মিলছে। গত ছয় মাসে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় পরিচালিত অভিযানে নিয়মিতভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনহীন ওষুধ উদ্ধার, মামলা ও জরিমানার ঘটনা প্রমাণ করে যে সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ওষুধ সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর তদারকির অভাব, অবিক্রীত ওষুধ ফেরত নেওয়ার দুর্বল ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগে শিথিলতার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ উৎপাদন, বিক্রি বা প্রদর্শনের অপরাধে এক বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। ভেজাল ওষুধ বিক্রি ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৫১ ধারায় মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বা ওষুধ বিক্রির জন্য এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাঠপর্যায়ে এসব আইনের কার্যকর প্রয়োগ এখনও সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ শুধু কার্যকারিতা হারায় না, বরং এতে ক্ষতিকর উপাদান তৈরি হয়ে রোগীর শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের ওষুধ সেবনে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, অঙ্গহানি এবং মৃত্যুর ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর সবুজবাগে ১৬ মাস বয়সী শিশু নাদিয়া খাতুন বমির জন্য স্থানীয় একটি ফার্মেসি থেকে কেনা ভিটামিন সিরাপ সেবনের পর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা দেখতে পান, ওষুধটির মেয়াদ ২০২৩ সালেই শেষ হয়েছিল। ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট ফার্মেসির মালিক ও কর্মচারীরা পালিয়ে যান।
একই বছরের অক্টোবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত চার বছর বয়সী শিশু আয়েশা মণিকে স্থানীয় এক কথিত চিকিৎসক আপেলিন নামের একটি আয়ুর্বেদিক সিরাপ দেন। ওষুধ সেবনের পরপরই শিশুটির মৃত্যু হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকের পরীক্ষায় সিরাপটি মেয়াদোত্তীর্ণ বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবার করা মামলায় ফার্মেসি মালিক মোস্তাকিম মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি মনজিল মোরসেদ বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল ওষুধ মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে বলে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও গুরুতর অপরাধে অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট শুধু জরিমানা করেই দায় শেষ করছে। তাঁর মতে, জনস্বার্থে এ ধরনের অপরাধে নিয়মিত আদালতে বিচার নিশ্চিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করা প্রয়োজন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অসাধু ব্যবসায়ী, কিছু ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি এবং একাংশ ফার্মেসি মালিক মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বিভিন্ন জেলায় অভিযান পরিচালনা করলেও জনবলসংকট এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কার্যক্রম প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের এক টেরিটরি সুপারভাইজার জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠান মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগেই সংশ্লিষ্ট ফার্মেসিকে ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে বলে এবং একই দামে মেয়াদোত্তীর্ণ বা মেয়াদোত্তীর্ণের কাছাকাছি থাকা ওষুধ ফেরত নেয়। তবে কোনো ফার্মেসি মালিক অতিরিক্ত লাভের আশায় ওষুধ ফেরত না দিয়ে বিক্রি করলে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির জন্য মূলত অসাধু ফার্মেসি মালিকরাই দায়ী। তাঁর মতে, দেশে দ্রুতগতিতে ফার্মেসির সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তদারকি সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির সুযোগে একশ্রেণির ব্যবসায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করছে।
তিনি আরও বলেন, ছোট ভেন্ডর, অপ্রচলিত উৎস এবং অনিবন্ধিত ফার্মেসি থেকে ওষুধ সংগ্রহের ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়ার ঝুঁকি বেশি। এসব ওষুধ রোগ সারানোর পরিবর্তে শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
গবেষণায়ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, জাপানের কানাজাওয়া ইউনিভার্সিটি এবং জার্মানির এবেরহার্ড কার্ল ইউনিভার্সিটির যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা গ্যাস্ট্রিক ও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের নমুনার প্রায় ১০ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের। একই সময়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে রাজধানীর অধিকাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেছে।
রাজধানীর বাইরে সমস্যার বিস্তারও স্পষ্ট। খুলনায় হেরাজ মার্কেটকে কেন্দ্র করে নকল, অনুমোদনহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের একটি সরবরাহচক্র গড়ে উঠেছে। জেলা ঔষধ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সেখানে ২৪টি মামলা করে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতি খুলনা জেলা শাখার আহ্বায়ক খান মাহাতাব আহমেদ বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধ বিক্রির দায় সমিতি নেবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
চট্টগ্রামে গত চার মাসে ১০০টি ওষুধের দোকানে অভিযান চালিয়ে ৯৫টি দোকানকে ১০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ২২টি দোকান সিলগালা এবং তিনজন ব্যবসায়ীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মো. ফখরুজ্জামান জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অবৈধ ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
রাজশাহী, ফেনী, মুন্সীগঞ্জ, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও পিরোজপুরেও বিভিন্ন অভিযানে মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যানেসথেসিয়া ইনজেকশন, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল, অনুমোদনহীন ওষুধ এবং দীর্ঘদিনের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের মজুদ পাওয়া গেছে। পাবনায় গত মে ও জুন মাসেই এ ধরনের অপরাধে ২৯টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে দুজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে ১৮টি ওষুধের দোকানকে তিন লাখ ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মানিকগঞ্জের একটি ফার্মেসিতে প্রায় ৩০ শতাংশ ওষুধের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কেন্দ্রীয় ঔষধাগার সূত্রে জানা গেছে, তাদের গুদামে সংরক্ষিত জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, ভ্যাকসিন ও চিকিৎসাসামগ্রীর ৩০ কোটি টাকার বেশি পণ্য মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খুচরা ফার্মেসি থেকে শুরু করে সরকারি সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে এই চিত্র দেশের ওষুধ ব্যবস্থাপনায় গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
নিয়ম অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত তিন মাস আগে ফার্মেসি কর্তৃপক্ষ ওষুধ কোম্পানিকে জানালে কোম্পানিকে সমপরিমাণ নতুন ওষুধ দিয়ে পুরোনো ওষুধ ফেরত নিতে হয়। কোনো অবস্থাতেই দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখা বা বিক্রি করা বৈধ নয়।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত ফার্মেসির সংখ্যা দুই লাখ ৩৫ হাজার ৫২১। গত বছরের জুন পর্যন্ত ৯৪ হাজার ৭৭৭টি ফার্মেসিকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিবন্ধনবিহীন ৫০ হাজারের বেশি ফার্মেসি রয়েছে। গত এক বছরে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণের অভিযোগে আড়াই হাজারের বেশি মামলা করা হয়েছে, জরিমানা আদায় হয়েছে এক কোটি ১৩ লাখ টাকা এবং সাতটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আকতার হোসেন বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আলাদা স্থানে সংরক্ষণ করা গেলেও তা বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সদ্যবিদায়ী মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ বলেন, দায়িত্বে থাকাকালে দেশের বড় বড় ফার্মেসিতেও বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সাধারণ ওষুধের সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধও একই শেলফে রেখেছিল। তাঁর মতে, কমিশন ও মুনাফার সুবিধা ভোগ করলেও স্বাস্থ্যঝুঁকির পুরো বোঝা বহন করতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিস্তার রোধে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জনবল বৃদ্ধি, নিয়মিত মনিটরিং, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, র্যাব, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান, লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসি বন্ধ এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। প্রতিটি ওষুধের প্যাকেটে কিউআর কোডভিত্তিক তথ্যসংরক্ষণ ব্যবস্থা চালুরও সুপারিশ করেছেন তারা।
ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ওষুধ কোম্পানিগুলোকেও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ফেরত নিয়ে ধ্বংস করার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, চিকিৎসা খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরো ওষুধ ব্যবস্থাপনাকে প্রযুক্তিনির্ভর করা এখন সময়ের দাবি।
রাজশাহী ঔষধ প্রশাসনের সহকারী পরিচালক কামরুল হাসান রোগীদের ওষুধ কেনার আগে মেয়াদ ও প্যাকেটের তথ্য যাচাই এবং লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসি থেকে ওষুধ না কেনার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়লেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের অবৈধ বাণিজ্য অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুলাই ২০২৬
দেশের বাজারে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনহীন ওষুধের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফার্মেসি, ওষুধের গুদাম এবং কিছু হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারেও এসব ওষুধের উপস্থিতি মিলছে। গত ছয় মাসে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় পরিচালিত অভিযানে নিয়মিতভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনহীন ওষুধ উদ্ধার, মামলা ও জরিমানার ঘটনা প্রমাণ করে যে সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ওষুধ সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর তদারকির অভাব, অবিক্রীত ওষুধ ফেরত নেওয়ার দুর্বল ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগে শিথিলতার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ উৎপাদন, বিক্রি বা প্রদর্শনের অপরাধে এক বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। ভেজাল ওষুধ বিক্রি ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৫১ ধারায় মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বা ওষুধ বিক্রির জন্য এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাঠপর্যায়ে এসব আইনের কার্যকর প্রয়োগ এখনও সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ শুধু কার্যকারিতা হারায় না, বরং এতে ক্ষতিকর উপাদান তৈরি হয়ে রোগীর শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের ওষুধ সেবনে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, অঙ্গহানি এবং মৃত্যুর ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর সবুজবাগে ১৬ মাস বয়সী শিশু নাদিয়া খাতুন বমির জন্য স্থানীয় একটি ফার্মেসি থেকে কেনা ভিটামিন সিরাপ সেবনের পর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা দেখতে পান, ওষুধটির মেয়াদ ২০২৩ সালেই শেষ হয়েছিল। ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট ফার্মেসির মালিক ও কর্মচারীরা পালিয়ে যান।
একই বছরের অক্টোবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত চার বছর বয়সী শিশু আয়েশা মণিকে স্থানীয় এক কথিত চিকিৎসক আপেলিন নামের একটি আয়ুর্বেদিক সিরাপ দেন। ওষুধ সেবনের পরপরই শিশুটির মৃত্যু হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকের পরীক্ষায় সিরাপটি মেয়াদোত্তীর্ণ বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবার করা মামলায় ফার্মেসি মালিক মোস্তাকিম মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি মনজিল মোরসেদ বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল ওষুধ মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে বলে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও গুরুতর অপরাধে অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট শুধু জরিমানা করেই দায় শেষ করছে। তাঁর মতে, জনস্বার্থে এ ধরনের অপরাধে নিয়মিত আদালতে বিচার নিশ্চিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করা প্রয়োজন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অসাধু ব্যবসায়ী, কিছু ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি এবং একাংশ ফার্মেসি মালিক মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বিভিন্ন জেলায় অভিযান পরিচালনা করলেও জনবলসংকট এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কার্যক্রম প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের এক টেরিটরি সুপারভাইজার জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠান মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগেই সংশ্লিষ্ট ফার্মেসিকে ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে বলে এবং একই দামে মেয়াদোত্তীর্ণ বা মেয়াদোত্তীর্ণের কাছাকাছি থাকা ওষুধ ফেরত নেয়। তবে কোনো ফার্মেসি মালিক অতিরিক্ত লাভের আশায় ওষুধ ফেরত না দিয়ে বিক্রি করলে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির জন্য মূলত অসাধু ফার্মেসি মালিকরাই দায়ী। তাঁর মতে, দেশে দ্রুতগতিতে ফার্মেসির সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তদারকি সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির সুযোগে একশ্রেণির ব্যবসায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করছে।
তিনি আরও বলেন, ছোট ভেন্ডর, অপ্রচলিত উৎস এবং অনিবন্ধিত ফার্মেসি থেকে ওষুধ সংগ্রহের ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়ার ঝুঁকি বেশি। এসব ওষুধ রোগ সারানোর পরিবর্তে শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
গবেষণায়ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, জাপানের কানাজাওয়া ইউনিভার্সিটি এবং জার্মানির এবেরহার্ড কার্ল ইউনিভার্সিটির যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা গ্যাস্ট্রিক ও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের নমুনার প্রায় ১০ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের। একই সময়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে রাজধানীর অধিকাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেছে।
রাজধানীর বাইরে সমস্যার বিস্তারও স্পষ্ট। খুলনায় হেরাজ মার্কেটকে কেন্দ্র করে নকল, অনুমোদনহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের একটি সরবরাহচক্র গড়ে উঠেছে। জেলা ঔষধ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সেখানে ২৪টি মামলা করে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতি খুলনা জেলা শাখার আহ্বায়ক খান মাহাতাব আহমেদ বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধ বিক্রির দায় সমিতি নেবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
চট্টগ্রামে গত চার মাসে ১০০টি ওষুধের দোকানে অভিযান চালিয়ে ৯৫টি দোকানকে ১০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ২২টি দোকান সিলগালা এবং তিনজন ব্যবসায়ীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মো. ফখরুজ্জামান জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অবৈধ ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
রাজশাহী, ফেনী, মুন্সীগঞ্জ, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও পিরোজপুরেও বিভিন্ন অভিযানে মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যানেসথেসিয়া ইনজেকশন, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল, অনুমোদনহীন ওষুধ এবং দীর্ঘদিনের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের মজুদ পাওয়া গেছে। পাবনায় গত মে ও জুন মাসেই এ ধরনের অপরাধে ২৯টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে দুজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে ১৮টি ওষুধের দোকানকে তিন লাখ ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মানিকগঞ্জের একটি ফার্মেসিতে প্রায় ৩০ শতাংশ ওষুধের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কেন্দ্রীয় ঔষধাগার সূত্রে জানা গেছে, তাদের গুদামে সংরক্ষিত জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, ভ্যাকসিন ও চিকিৎসাসামগ্রীর ৩০ কোটি টাকার বেশি পণ্য মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খুচরা ফার্মেসি থেকে শুরু করে সরকারি সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে এই চিত্র দেশের ওষুধ ব্যবস্থাপনায় গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
নিয়ম অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত তিন মাস আগে ফার্মেসি কর্তৃপক্ষ ওষুধ কোম্পানিকে জানালে কোম্পানিকে সমপরিমাণ নতুন ওষুধ দিয়ে পুরোনো ওষুধ ফেরত নিতে হয়। কোনো অবস্থাতেই দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখা বা বিক্রি করা বৈধ নয়।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত ফার্মেসির সংখ্যা দুই লাখ ৩৫ হাজার ৫২১। গত বছরের জুন পর্যন্ত ৯৪ হাজার ৭৭৭টি ফার্মেসিকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিবন্ধনবিহীন ৫০ হাজারের বেশি ফার্মেসি রয়েছে। গত এক বছরে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণের অভিযোগে আড়াই হাজারের বেশি মামলা করা হয়েছে, জরিমানা আদায় হয়েছে এক কোটি ১৩ লাখ টাকা এবং সাতটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আকতার হোসেন বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আলাদা স্থানে সংরক্ষণ করা গেলেও তা বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সদ্যবিদায়ী মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ বলেন, দায়িত্বে থাকাকালে দেশের বড় বড় ফার্মেসিতেও বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সাধারণ ওষুধের সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধও একই শেলফে রেখেছিল। তাঁর মতে, কমিশন ও মুনাফার সুবিধা ভোগ করলেও স্বাস্থ্যঝুঁকির পুরো বোঝা বহন করতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিস্তার রোধে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জনবল বৃদ্ধি, নিয়মিত মনিটরিং, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, র্যাব, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান, লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসি বন্ধ এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। প্রতিটি ওষুধের প্যাকেটে কিউআর কোডভিত্তিক তথ্যসংরক্ষণ ব্যবস্থা চালুরও সুপারিশ করেছেন তারা।
ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ওষুধ কোম্পানিগুলোকেও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ফেরত নিয়ে ধ্বংস করার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, চিকিৎসা খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরো ওষুধ ব্যবস্থাপনাকে প্রযুক্তিনির্ভর করা এখন সময়ের দাবি।
রাজশাহী ঔষধ প্রশাসনের সহকারী পরিচালক কামরুল হাসান রোগীদের ওষুধ কেনার আগে মেয়াদ ও প্যাকেটের তথ্য যাচাই এবং লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসি থেকে ওষুধ না কেনার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়লেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের অবৈধ বাণিজ্য অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন