দেশের সব চেয়ে বড় বিল চলনবিল। এ বিল শুধু যে মৎস্য ভান্ডার শস্য ভান্ডার নামে পরিচিত তা কিন্তু নয়। বর্ষার এক অপরুপ প্রকৃতির সৌন্দর্যের নীলা ভূমি এই চলনবিল। জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এ বিলেরই একটা বড় অংশ জুড়ে ফুটে উঠে সাদা ও লাল শাপলা। সাধারণত প্রতি বছর শরৎকালে চলনবিলে দৃষ্টিনন্দন শাপলার চোখ জুড়ানো সমারোহ দেখা গেলেও, এবার শ্রাবণের শুরুতেই বিলের বুক জুড়ে ফুটেছে লাল-সাদা শাপলা। আর এই আগাম শাপলাকে কেন্দ্র করেই এখন চলনবিল জুড়ে চলছে শাপলা তোলার ধুম। একদিকে যেমন প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা, অন্যদিকে এই শাপলাই হয়ে উঠেছে বিলপাড়ের শত শত কর্মহীন মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন।বর্ষায় চলনবিল এলাকার একটা বড় অংশের খেটে খাওয়া মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন। খেত-খামারে কাজ না থাকায় তীব্র সংকটে পড়েন তারা। তবে এবারের আগাম শাপলা তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। প্রতিদিন ভোর হতেই ডিঙি নৌকা নিয়ে বিলের জমিতে ছুটে যাচ্ছেন তারা।বিলের বুক থেকে কচি শাপলা তুলে আঁটি বেঁধে নিয়ে আসছেন স্থানীয় বাজারে। তরকারি হিসেবে শাপলার বেশ চাহিদা থাকায় বিক্রিও হচ্ছে বেশ ভালো দামে।সিংড়া সোহাগ বাড়ি এলাকার বাসিন্দা সাদেক আলী (৪৫) জানান, "বর্ষার এই সময়টায় আমাদের কোনো কাজ থাকে না। শাপলা তুলে বিক্রি করি। কিন্তু এবার আল্লাহ আগেভাগেই বিলে শাপলা ফুটিয়েছেন। প্রতিদিন ভোরে নৌকা নিয়ে বের হই, দুপুর পর্যন্ত শাপলা তুলে আঁটি বেঁধে সকালের সিংড়া বাজারে বিক্রি করি। এতে আমার প্রতিদিন ৫০০টাকা থেকে ৭০০ টাকার বিক্রি হয়। এই দুর্যোগের দিনে শাপলা বিক্রি করেই এখন আমাদের সংসার চলে।"শাপলা শুধু জীবিকারই উৎস নয়, স্থানীয় তরুণ ও শিক্ষার্থীদের জন্য এটি হয়ে উঠেছে বিনোদনের এক চমৎকার মাধ্যম। সিংড়া গোল-ই আফরোজ সরকারি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী আলী হাসান জানান, এইচএসসি পরীক্ষার কারণে বর্তমানে কলেজ বন্ধ রয়েছে। অবসর সময়টাকে কাজে লাগিয়ে তারা তিন বন্ধু মিলে ডিঙি নৌকা নিয়ে বিল থেকে শাপলা তুলতে এসেছিলেন। সেই শাপলা তেঁতুলের টক দিয়ে মেখে খাওয়ার আনন্দটাই আলাদা।সব মিলিয়ে চলনবিলে এখন এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। একদিকে যেমন ফুটে থাকা দৃষ্টিনন্দন শাপলা মানুষের মনের খোরাক জোগাচ্ছে, অন্যদিকে অভাবী মানুষের পেটের ভাত নিশ্চিত করছে। বর্ষার অপরূপ রূপ আর জীবনের কঠিন বাস্তবতার এমন চমৎকার ও মানবিক মেলবন্ধন চলনবিলকে করে তুলেছে অনন্য ও দৃষ্টিনন্দন।