দৈনিক লাল বার্তা

৭৯ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার তদন্ত এখনো অসম্পূর্ণ



৭৯ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার তদন্ত এখনো অসম্পূর্ণ

৭৯ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল তথা জামুকা সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই অভিযোগগুলো সংস্থাটির কাছে আসে এবং ২০২৪ সালে মাঠপর্যায়ে শুনানি শুরু হয়। বর্তমান সরকার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়ে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর জালিয়াতি ও ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণের অভিযোগে ৭১ জনের গেজেট বাতিল করা হয়। এর মধ্যে ১২ জন নিজেই অপরাধ স্বীকার করে স্বেচ্ছায় বাতিলের আবেদন করেন। এর আগে নির্ধারিত বয়সসীমা অর্থাৎ ১২ বছর ৬ মাসের কম বয়স প্রমাণিত হওয়ায় দুই হাজার ১১১ জনের সনদ বাতিল করা হয়েছে। জামুকা প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ছয় হাজার ৪৭৬ জনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল হয়েছে।

এর পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালনকারী মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামানের নাম। ৮১ ব্যাচের এই সাবেক সচিব বর্তমানে ভারতে পলাতক রয়েছেন। তদন্তে উঠে এসেছে, তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন। মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান এর আগেও বিতর্কে এসেছিলেন। ১৯৮৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনকালে নিরীহ জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

জামুকার পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) উপ-সচিব মোহাম্মদ উল্যাহ জানিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে শুনানি চলছে এবং যাচাই-বাছাই করেই সনদ বাতিল করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফোনে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির পেছনে কাজ করেছে মূলত রাষ্ট্রীয় ভাতা, সরকারি চাকরিতে কোটা সুবিধা এবং এলাকায় সামাজিক প্রভাব বিস্তারের লোভ। জামুকায় জমা পড়া আবেদনকারীদের একটি বড় অংশ নিজেদের শরণার্থী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করেছেন এবং ভুয়া ছবি সংযুক্ত করার অভিযোগও রয়েছে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে ৭৮ হাজার ৯৫ জনকে প্রাথমিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। ১৯৮৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম তালিকা প্রকাশ হলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় এক লাখ দুই হাজার ৪৫৮-এ। পরবর্তী দশকগুলোতে তালিকা ক্রমেই বেড়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে দুই লাখ ১০ হাজার ৫৮১ জনকে তালিকাভুক্ত করা হয়। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নতুন আবেদন জমা পড়ে এক লাখ ৩৯ হাজার। বর্তমানে সরকারি তালিকায় মোট মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এক লাখ ৯৮ হাজার ৩৭ জন। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে এক লাখ ১৭ হাজার ৯৩৯ জন।

সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন ৮৯ হাজার ২৩৫ জন। গেজেট বাতিল এবং বয়সসীমা নির্ধারণসহ প্রায় ১৪টি ক্যাটাগরিতে মোট মামলার সংখ্যা দুই হাজার ৭১৯টি। গত সাত মাসে আরো দেড় হাজার নতুন আবেদন জমা পড়েছে বলে জামুকা সূত্র জানিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বাদ দিতে গিয়ে যাতে কোনো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বাদ না পড়েন, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। কারণ বয়স, রাজনৈতিক বিবেচনা বা আগ্রহের অভাবে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কখনো সরকারের কাছে নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নথিভুক্ত করাননি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত গণশুনানির আয়োজন এবং আদালতে মামলাকারীদের বিষয়ে দ্রুত শুনানি সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও সূত্র নিশ্চিত করেছে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক লাল বার্তা

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬


৭৯ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার তদন্ত এখনো অসম্পূর্ণ

প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬

featured Image



৭৯ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল তথা জামুকা সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই অভিযোগগুলো সংস্থাটির কাছে আসে এবং ২০২৪ সালে মাঠপর্যায়ে শুনানি শুরু হয়। বর্তমান সরকার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়ে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।


মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর জালিয়াতি ও ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণের অভিযোগে ৭১ জনের গেজেট বাতিল করা হয়। এর মধ্যে ১২ জন নিজেই অপরাধ স্বীকার করে স্বেচ্ছায় বাতিলের আবেদন করেন। এর আগে নির্ধারিত বয়সসীমা অর্থাৎ ১২ বছর ৬ মাসের কম বয়স প্রমাণিত হওয়ায় দুই হাজার ১১১ জনের সনদ বাতিল করা হয়েছে। জামুকা প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ছয় হাজার ৪৭৬ জনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল হয়েছে।


এর পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালনকারী মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামানের নাম। ৮১ ব্যাচের এই সাবেক সচিব বর্তমানে ভারতে পলাতক রয়েছেন। তদন্তে উঠে এসেছে, তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন। মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান এর আগেও বিতর্কে এসেছিলেন। ১৯৮৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনকালে নিরীহ জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।


জামুকার পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) উপ-সচিব মোহাম্মদ উল্যাহ জানিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে শুনানি চলছে এবং যাচাই-বাছাই করেই সনদ বাতিল করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফোনে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির পেছনে কাজ করেছে মূলত রাষ্ট্রীয় ভাতা, সরকারি চাকরিতে কোটা সুবিধা এবং এলাকায় সামাজিক প্রভাব বিস্তারের লোভ। জামুকায় জমা পড়া আবেদনকারীদের একটি বড় অংশ নিজেদের শরণার্থী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করেছেন এবং ভুয়া ছবি সংযুক্ত করার অভিযোগও রয়েছে।


পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে ৭৮ হাজার ৯৫ জনকে প্রাথমিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। ১৯৮৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম তালিকা প্রকাশ হলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় এক লাখ দুই হাজার ৪৫৮-এ। পরবর্তী দশকগুলোতে তালিকা ক্রমেই বেড়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে দুই লাখ ১০ হাজার ৫৮১ জনকে তালিকাভুক্ত করা হয়। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নতুন আবেদন জমা পড়ে এক লাখ ৩৯ হাজার। বর্তমানে সরকারি তালিকায় মোট মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এক লাখ ৯৮ হাজার ৩৭ জন। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে এক লাখ ১৭ হাজার ৯৩৯ জন।


সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন ৮৯ হাজার ২৩৫ জন। গেজেট বাতিল এবং বয়সসীমা নির্ধারণসহ প্রায় ১৪টি ক্যাটাগরিতে মোট মামলার সংখ্যা দুই হাজার ৭১৯টি। গত সাত মাসে আরো দেড় হাজার নতুন আবেদন জমা পড়েছে বলে জামুকা সূত্র জানিয়েছে।


মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বাদ দিতে গিয়ে যাতে কোনো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বাদ না পড়েন, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। কারণ বয়স, রাজনৈতিক বিবেচনা বা আগ্রহের অভাবে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কখনো সরকারের কাছে নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নথিভুক্ত করাননি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত গণশুনানির আয়োজন এবং আদালতে মামলাকারীদের বিষয়ে দ্রুত শুনানি সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও সূত্র নিশ্চিত করেছে।


দৈনিক লাল বার্তা

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা