দৈনিক লাল বার্তা

কাজের চাপে পিষ্ট কেউ, কারও হাতে নেই কাজ



কাজের চাপে পিষ্ট কেউ, কারও হাতে নেই কাজ

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পার হলেও প্রশাসনের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদে শতভাগ আস্থাভাজন ও দক্ষ কর্মকর্তা বাছাইয়ে জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে সরকারকে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে আস্থাভাজন হিসেবে বিবেচিত কর্মকর্তাদের ওপর একসঙ্গে তিন-চারটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত কাজের চাপে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, সরকার যাদের আস্থাভাজন মনে করছে না, তাদের অগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে অথবা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। এতে প্রশাসনিক কার্যকারিতা, কাজের গতি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন কর্মকর্তার হাতে একাধিক দায়িত্ব থাকলে কোনো কাজই যথাযথভাবে সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আস্থাভাজন কর্মকর্তা বাছাইয়ে জটিলতা

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তাদের রদবদল চলমান রয়েছে। নিয়মিত কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় তাদের মধ্য থেকে উপযুক্ত ও আস্থাভাজন কর্মকর্তা বাছাই নিয়েও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

এ অবস্থায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বিএনপির আগের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে। বর্তমানে সচিব বা সমমর্যাদার ৭৯ কর্মকর্তার মধ্যে ২৩ জনই চুক্তিভিত্তিক, যা মোট কর্মকর্তার প্রায় ২৯ শতাংশ।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব কিংবা সমমর্যাদার পদে নিয়োগের জন্য নিয়মিত কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকাও করা হয়েছে। তবে তাদের অনেকের বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদন মিলছে না। আবার যাদের এসিআর ইতিবাচক, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় তাদেরও চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।

তিন শতাধিক কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্বে

জনপ্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত তিন শতাধিক কর্মকর্তা মূল পদের পাশাপাশি একাধিক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।

এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সবচেয়ে বেশি কর্মকর্তা একসঙ্গে একাধিক দায়িত্বে রয়েছেন। এই মন্ত্রণালয়ের ২৫ জন কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্ব পালন করছেন। অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবু নঈম একাই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অনুবিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। এগুলো হলো প্রশাসন ও অর্থ, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, মেডিক্যাল এবং আরএম অ্যান্ড পিআর ইউনিট।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ তিনটি অনুবিভাগের নিরাপত্তা, বহিরাগমন ও রাজনৈতিক দায়িত্বে রয়েছেন। অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মাদ মফিজুর রহমান অগ্নি, আইন ও জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন—এই তিনটি অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। অতিরিক্ত সচিব কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম শৃঙ্খলা অনুবিভাগের পাশাপাশি আনসার ও সীমান্ত অনুবিভাগের দায়িত্বেও রয়েছেন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ খালেদ হাসান একসঙ্গে ব্লু ইকোনমি, সমন্বয় ও সংস্কার—এই তিনটি অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। একই বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন।

এভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ১৪ জন কর্মকর্তা, অর্থ বিভাগে ৯ জন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সাতজন, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে ছয়জন, কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঁচজন, স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঁচজন এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগে পাঁচজন কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্বে রয়েছেন।

একইভাবে যুগ্ম সচিব থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব পর্যায়েও অনেকে দুই থেকে চারটি করে অনুবিভাগ সামলাচ্ছেন। অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ শাখায় কর্মরত। ফলে একই কর্মকর্তাকে ভিন্ন প্রকৃতির দুটি দপ্তরের কার্যক্রম তদারকি করতে হচ্ছে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িকভাবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় ধরে একই ব্যবস্থা চললে কাজের গতি কমে যেতে পারে। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের কারণে কর্মকর্তাদের মানসিক ও কাজের চাপ বাড়ার পাশাপাশি ফাইলের গতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই শূন্যপদে দ্রুত পদায়ন এবং দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে পরিস্থিতির সমাধান প্রয়োজন।

সাত শতাধিক কর্মকর্তা ওএসডি

সূত্র জানায়, জনপ্রশাসনের বিভিন্ন ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের প্রায় সাত শতাধিক কর্মকর্তা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হয়ে আছেন। তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলে ওএসডি অথবা সংযুক্ত অবস্থায় রয়েছেন।

এসব কর্মকর্তার কোনো ডেস্ক নেই, বসার জন্য দপ্তর নেই এবং কোনো শাখা বা উইংয়ের দায়িত্বও নেই। তবে মাস শেষে তারা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন এবং চাকরির অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও বহাল রয়েছে।

বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যারা ওই সরকারের আস্থাভাজন ছিলেন, তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হচ্ছে অথবা ওএসডি করা হয়েছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ৩২ যুগ্ম সচিবকে একসঙ্গে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে বর্তমান সরকার। তারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রশাসনে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদ রয়েছে ৮৯টি, অতিরিক্ত সচিবের পদ ২১২টি, যুগ্ম সচিবের ৫০২টি, উপসচিবের ১ হাজার ৭৫০টি এবং সিনিয়র সহকারী সচিবের ১ হাজার ১৪৩টি।

এর বিপরীতে প্রশাসনে কর্মরত সচিব রয়েছেন ৮৩ জন, অতিরিক্ত সচিব ৩৫৩ জন, যুগ্ম সচিব ১ হাজার ২৬ জন, উপসচিব ১ হাজার ৪৮৫ জন এবং সিনিয়র সহকারী সচিব ২ হাজার ১১৯ জন। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপসচিব ছাড়া সব পদেই কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি।

প্রশাসনের দলীয়করণ নিয়ে সাবেক সচিবের বক্তব্য

সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার  বলেন, প্রশাসনের মূল সমস্যা আমলারা নিজেরাই। দলবাজির কারণে তারাই নিজেদের অবস্থান নষ্ট করেছেন। সব রাজনৈতিক সরকারই প্রশাসনে দলীয়করণ করেছে। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলীয়করণ মাত্রা ছাড়িয়ে যায় এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আমলাদের চরমভাবে ব্যবহার করা হয়।

তার মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যারা অতিদলবাজি করেছেন, তাদের সরিয়ে দেওয়া স্বাভাবিক। যারা কম দলবাজি করেছেন, তাদের অগুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কাজ করানো যেতে পারে। তবে কেউ যেন অন্যায়ভাবে প্রতিহিংসার শিকার না হন, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো সরকারই মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের পছন্দ ও রাজনৈতিক আদর্শের বাইরে কাউকে দায়িত্ব দেয় না। ফলে একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এতে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দেরি কিংবা কাজের গতি কমলেও সরকারের কিছু করার নেই। সরকার আস্থাভাজন কর্মকর্তা খুঁজবে এবং এতে সরকারের কোনো দোষ তিনি দেখছেন না।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক লাল বার্তা

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কাজের চাপে পিষ্ট কেউ, কারও হাতে নেই কাজ

প্রকাশের তারিখ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image



বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পার হলেও প্রশাসনের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদে শতভাগ আস্থাভাজন ও দক্ষ কর্মকর্তা বাছাইয়ে জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে সরকারকে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে আস্থাভাজন হিসেবে বিবেচিত কর্মকর্তাদের ওপর একসঙ্গে তিন-চারটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত কাজের চাপে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।


অন্যদিকে, সরকার যাদের আস্থাভাজন মনে করছে না, তাদের অগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে অথবা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। এতে প্রশাসনিক কার্যকারিতা, কাজের গতি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন কর্মকর্তার হাতে একাধিক দায়িত্ব থাকলে কোনো কাজই যথাযথভাবে সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।


আস্থাভাজন কর্মকর্তা বাছাইয়ে জটিলতা


সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তাদের রদবদল চলমান রয়েছে। নিয়মিত কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় তাদের মধ্য থেকে উপযুক্ত ও আস্থাভাজন কর্মকর্তা বাছাই নিয়েও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।


এ অবস্থায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বিএনপির আগের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে। বর্তমানে সচিব বা সমমর্যাদার ৭৯ কর্মকর্তার মধ্যে ২৩ জনই চুক্তিভিত্তিক, যা মোট কর্মকর্তার প্রায় ২৯ শতাংশ।


বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব কিংবা সমমর্যাদার পদে নিয়োগের জন্য নিয়মিত কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকাও করা হয়েছে। তবে তাদের অনেকের বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদন মিলছে না। আবার যাদের এসিআর ইতিবাচক, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় তাদেরও চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।


তিন শতাধিক কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্বে


জনপ্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত তিন শতাধিক কর্মকর্তা মূল পদের পাশাপাশি একাধিক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।


এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সবচেয়ে বেশি কর্মকর্তা একসঙ্গে একাধিক দায়িত্বে রয়েছেন। এই মন্ত্রণালয়ের ২৫ জন কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্ব পালন করছেন। অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবু নঈম একাই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অনুবিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। এগুলো হলো প্রশাসন ও অর্থ, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, মেডিক্যাল এবং আরএম অ্যান্ড পিআর ইউনিট।


স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ তিনটি অনুবিভাগের নিরাপত্তা, বহিরাগমন ও রাজনৈতিক দায়িত্বে রয়েছেন। অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মাদ মফিজুর রহমান অগ্নি, আইন ও জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন—এই তিনটি অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। অতিরিক্ত সচিব কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম শৃঙ্খলা অনুবিভাগের পাশাপাশি আনসার ও সীমান্ত অনুবিভাগের দায়িত্বেও রয়েছেন।


মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ খালেদ হাসান একসঙ্গে ব্লু ইকোনমি, সমন্বয় ও সংস্কার—এই তিনটি অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। একই বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন।


এভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ১৪ জন কর্মকর্তা, অর্থ বিভাগে ৯ জন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সাতজন, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে ছয়জন, কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঁচজন, স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঁচজন এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগে পাঁচজন কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্বে রয়েছেন।


একইভাবে যুগ্ম সচিব থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব পর্যায়েও অনেকে দুই থেকে চারটি করে অনুবিভাগ সামলাচ্ছেন। অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ শাখায় কর্মরত। ফলে একই কর্মকর্তাকে ভিন্ন প্রকৃতির দুটি দপ্তরের কার্যক্রম তদারকি করতে হচ্ছে।


জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িকভাবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় ধরে একই ব্যবস্থা চললে কাজের গতি কমে যেতে পারে। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের কারণে কর্মকর্তাদের মানসিক ও কাজের চাপ বাড়ার পাশাপাশি ফাইলের গতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই শূন্যপদে দ্রুত পদায়ন এবং দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে পরিস্থিতির সমাধান প্রয়োজন।


সাত শতাধিক কর্মকর্তা ওএসডি


সূত্র জানায়, জনপ্রশাসনের বিভিন্ন ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের প্রায় সাত শতাধিক কর্মকর্তা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হয়ে আছেন। তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলে ওএসডি অথবা সংযুক্ত অবস্থায় রয়েছেন।


এসব কর্মকর্তার কোনো ডেস্ক নেই, বসার জন্য দপ্তর নেই এবং কোনো শাখা বা উইংয়ের দায়িত্বও নেই। তবে মাস শেষে তারা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন এবং চাকরির অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও বহাল রয়েছে।


বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যারা ওই সরকারের আস্থাভাজন ছিলেন, তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হচ্ছে অথবা ওএসডি করা হয়েছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ৩২ যুগ্ম সচিবকে একসঙ্গে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে বর্তমান সরকার। তারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।


জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রশাসনে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদ রয়েছে ৮৯টি, অতিরিক্ত সচিবের পদ ২১২টি, যুগ্ম সচিবের ৫০২টি, উপসচিবের ১ হাজার ৭৫০টি এবং সিনিয়র সহকারী সচিবের ১ হাজার ১৪৩টি।


এর বিপরীতে প্রশাসনে কর্মরত সচিব রয়েছেন ৮৩ জন, অতিরিক্ত সচিব ৩৫৩ জন, যুগ্ম সচিব ১ হাজার ২৬ জন, উপসচিব ১ হাজার ৪৮৫ জন এবং সিনিয়র সহকারী সচিব ২ হাজার ১১৯ জন। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপসচিব ছাড়া সব পদেই কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি।


প্রশাসনের দলীয়করণ নিয়ে সাবেক সচিবের বক্তব্য


সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার  বলেন, প্রশাসনের মূল সমস্যা আমলারা নিজেরাই। দলবাজির কারণে তারাই নিজেদের অবস্থান নষ্ট করেছেন। সব রাজনৈতিক সরকারই প্রশাসনে দলীয়করণ করেছে। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলীয়করণ মাত্রা ছাড়িয়ে যায় এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আমলাদের চরমভাবে ব্যবহার করা হয়।


তার মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যারা অতিদলবাজি করেছেন, তাদের সরিয়ে দেওয়া স্বাভাবিক। যারা কম দলবাজি করেছেন, তাদের অগুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কাজ করানো যেতে পারে। তবে কেউ যেন অন্যায়ভাবে প্রতিহিংসার শিকার না হন, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।


এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো সরকারই মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের পছন্দ ও রাজনৈতিক আদর্শের বাইরে কাউকে দায়িত্ব দেয় না। ফলে একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এতে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দেরি কিংবা কাজের গতি কমলেও সরকারের কিছু করার নেই। সরকার আস্থাভাজন কর্মকর্তা খুঁজবে এবং এতে সরকারের কোনো দোষ তিনি দেখছেন না।


দৈনিক লাল বার্তা

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা