দৈনিক লাল বার্তা

দেড় দশকে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা বেড়েছে ৯ গুণ



দেড় দশকে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা বেড়েছে ৯ গুণ

দেশের বিদ্যুৎ খাতে গত দেড় দশকে ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়ার ব্যয় ৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও সংশ্লিষ্ট খাতের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় এই চিত্র উঠে এসেছে।

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ইউনিটপ্রতি ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে ২ টাকা ৩৫ পয়সা প্রদান করা হতো। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই হার বেড়ে ৫ টাকা ২৪ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ইউনিটপ্রতি এই ব্যয়ের পরিমাণ ৫ টাকা ৪৬ পয়সায় পৌঁছাতে পারে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তৎকালীন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন যে, বিগত ১৪ বছরে ৮২টি বেসরকারি এবং ৩২টি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ মোট ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

বর্তমানে দেশে আমদানিসহ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি নয় এবং গড় উৎপাদন প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করে রাখা হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট ৭৮টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে যাদের সক্ষমতা প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট। সরকারি ৫৫টি কেন্দ্রের সক্ষমতা ১০ হাজার ৭৫৮ মেগাওয়াট হলেও সেগুলোর ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জের বিধান নেই। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বিনিয়োগ, ঋণ ও পরিচালন ব্যয় নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকলেও চুক্তির শর্তানুসারে পিডিবিকে এই চার্জ পরিশোধ করতে হয়।

সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ অভিযোগ করেন যে, বিগত সরকারের আমলে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিপুল অর্থ লুটপাট হয়েছে। তিনি জানান, আইনি জটিলতার কারণে বর্তমানে এসব চুক্তি পর্যালোচনা করা যাচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। অনুকূল মতামত পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। মন্ত্রীর মতে, বিগত সরকার সংস্কার না করে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখেছিল।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ১৯৯৮ সালে খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে এই চার্জ বা ফিক্সড কস্ট প্রদানের প্রথা শুরু হয়। ২০১০ সালের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এই ব্যয়টি বড় বোঝা হিসেবে দেখা দেয়। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম এই ব্যবস্থাকে লুণ্ঠনমূলক প্রকল্প হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ আইনের আওতায় করা এসব চুক্তির কারণে জনগণের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তিনি এই অন্যায্য চুক্তির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার এবং জ্বালানি অপরাধ চিহ্নিত করতে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের দাবি জানান। এক্ষেত্রে সাবেক সরকারের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি উপদেষ্টা ও সচিবদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্ত করার জন্য তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনকে পরামর্শ দেন।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক লাল বার্তা

বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬


দেড় দশকে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা বেড়েছে ৯ গুণ

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬

featured Image


দেশের বিদ্যুৎ খাতে গত দেড় দশকে ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়ার ব্যয় ৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও সংশ্লিষ্ট খাতের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় এই চিত্র উঠে এসেছে।


পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ইউনিটপ্রতি ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে ২ টাকা ৩৫ পয়সা প্রদান করা হতো। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই হার বেড়ে ৫ টাকা ২৪ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ইউনিটপ্রতি এই ব্যয়ের পরিমাণ ৫ টাকা ৪৬ পয়সায় পৌঁছাতে পারে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তৎকালীন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন যে, বিগত ১৪ বছরে ৮২টি বেসরকারি এবং ৩২টি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ মোট ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।


বর্তমানে দেশে আমদানিসহ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি নয় এবং গড় উৎপাদন প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করে রাখা হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট ৭৮টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে যাদের সক্ষমতা প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট। সরকারি ৫৫টি কেন্দ্রের সক্ষমতা ১০ হাজার ৭৫৮ মেগাওয়াট হলেও সেগুলোর ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জের বিধান নেই। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বিনিয়োগ, ঋণ ও পরিচালন ব্যয় নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকলেও চুক্তির শর্তানুসারে পিডিবিকে এই চার্জ পরিশোধ করতে হয়।


সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ অভিযোগ করেন যে, বিগত সরকারের আমলে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিপুল অর্থ লুটপাট হয়েছে। তিনি জানান, আইনি জটিলতার কারণে বর্তমানে এসব চুক্তি পর্যালোচনা করা যাচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। অনুকূল মতামত পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। মন্ত্রীর মতে, বিগত সরকার সংস্কার না করে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখেছিল।


খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ১৯৯৮ সালে খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে এই চার্জ বা ফিক্সড কস্ট প্রদানের প্রথা শুরু হয়। ২০১০ সালের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এই ব্যয়টি বড় বোঝা হিসেবে দেখা দেয়। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম এই ব্যবস্থাকে লুণ্ঠনমূলক প্রকল্প হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ আইনের আওতায় করা এসব চুক্তির কারণে জনগণের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তিনি এই অন্যায্য চুক্তির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার এবং জ্বালানি অপরাধ চিহ্নিত করতে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের দাবি জানান। এক্ষেত্রে সাবেক সরকারের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি উপদেষ্টা ও সচিবদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্ত করার জন্য তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনকে পরামর্শ দেন।


দৈনিক লাল বার্তা

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা