দৈনিক লাল বার্তা

সংসার থেকে সমাজ: রায়গঞ্জে জীবনযুদ্ধে অদম্য আদিবাসী নারী



সংসার থেকে সমাজ: রায়গঞ্জে জীবনযুদ্ধে অদম্য আদিবাসী নারী

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাসরত আদিবাসী নারীরা পরিবার, সমাজ ও জীবিকার দায়িত্ব একসঙ্গে বহন করে চলেছেন। নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তারা পরিবারকে আগলে রাখার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া, ধুবিল ও ধামাইনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে এসব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী তাড়াশ উপজেলার দেশীগ্রাম, তালম, নওগাঁ, মাধাইনগর, বারুহাঁস, তাড়াশ সদর, মাগুরা ও বিনোদ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও তাদের বসবাস রয়েছে।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলার প্রায় ১০২টি গ্রামে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। তাদের মধ্যে ওঁরাও, মাহাতো, সাঁওতাল, মুড়ারি, রবিদাস, কনকদাস, সিং, তেলি, তুড়ি, বসাইকসহ প্রায় ১৪-১৫টি সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন। এদের মধ্যে ৪-৫ হাজার মানুষ ছাড়া অধিকাংশই রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বসবাস করছেন।

জীবিকার তাগিদে এসব জনগোষ্ঠীর অনেকেই কৃষিকাজ, দিনমজুরি, গৃহস্থালি কাজসহ বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আদিবাসী নারীদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের কাজ, সন্তানদের দেখাশোনা ও রান্নাবান্নার পাশাপাশি কৃষিকাজ এবং পরিবারের আয়-রোজগারে অংশ নিয়ে তারা সংসারের হাল ধরে রাখছেন।

সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ-তাড়াশ-সলঙ্গা) আসনের সংসদ সদস্য ভিপি আয়নুল হক বলেন, ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। বিশেষ করে নারীরা ঘর-সংসার সামলানোর পাশাপাশি কৃষিকাজ ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাদের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং নারীদের আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। এ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে যে কোনো যৌক্তিক উদ্যোগে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি পাশে থাকার চেষ্টা করব।’

রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, ‘উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সরকারি সেবা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা যেন কোনোভাবে পিছিয়ে না থাকে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক মূল্যবোধকে সম্মান জানিয়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সেবা প্রদানের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’

প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, সরল জীবনযাপন, কঠোর পরিশ্রম এবং নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রাখার দৃঢ়তা এসব আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, আদিবাসী নারীদের জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

নীরবে পরিবার ও সমাজের জন্য কাজ করে যাওয়া এসব আদিবাসী নারীর জীবনসংগ্রাম আমাদের শেখায় সম্মান, অধ্যবসায় ও শিকড়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের মূল্য। তাদের জীবন ও সংস্কৃতির প্রতি রয়েছে আন্তরিক শ্রদ্ধা।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক লাল বার্তা

শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬


সংসার থেকে সমাজ: রায়গঞ্জে জীবনযুদ্ধে অদম্য আদিবাসী নারী

প্রকাশের তারিখ : ৩১ জুলাই ২০২৬

featured Image




সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাসরত আদিবাসী নারীরা পরিবার, সমাজ ও জীবিকার দায়িত্ব একসঙ্গে বহন করে চলেছেন। নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তারা পরিবারকে আগলে রাখার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।


রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া, ধুবিল ও ধামাইনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে এসব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী তাড়াশ উপজেলার দেশীগ্রাম, তালম, নওগাঁ, মাধাইনগর, বারুহাঁস, তাড়াশ সদর, মাগুরা ও বিনোদ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও তাদের বসবাস রয়েছে।


স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলার প্রায় ১০২টি গ্রামে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। তাদের মধ্যে ওঁরাও, মাহাতো, সাঁওতাল, মুড়ারি, রবিদাস, কনকদাস, সিং, তেলি, তুড়ি, বসাইকসহ প্রায় ১৪-১৫টি সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন। এদের মধ্যে ৪-৫ হাজার মানুষ ছাড়া অধিকাংশই রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বসবাস করছেন।


জীবিকার তাগিদে এসব জনগোষ্ঠীর অনেকেই কৃষিকাজ, দিনমজুরি, গৃহস্থালি কাজসহ বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আদিবাসী নারীদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের কাজ, সন্তানদের দেখাশোনা ও রান্নাবান্নার পাশাপাশি কৃষিকাজ এবং পরিবারের আয়-রোজগারে অংশ নিয়ে তারা সংসারের হাল ধরে রাখছেন।


সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ-তাড়াশ-সলঙ্গা) আসনের সংসদ সদস্য ভিপি আয়নুল হক বলেন, ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। বিশেষ করে নারীরা ঘর-সংসার সামলানোর পাশাপাশি কৃষিকাজ ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাদের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং নারীদের আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। এ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে যে কোনো যৌক্তিক উদ্যোগে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি পাশে থাকার চেষ্টা করব।’


রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, ‘উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সরকারি সেবা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা যেন কোনোভাবে পিছিয়ে না থাকে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক মূল্যবোধকে সম্মান জানিয়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সেবা প্রদানের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’


প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, সরল জীবনযাপন, কঠোর পরিশ্রম এবং নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রাখার দৃঢ়তা এসব আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।


স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, আদিবাসী নারীদের জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।


নীরবে পরিবার ও সমাজের জন্য কাজ করে যাওয়া এসব আদিবাসী নারীর জীবনসংগ্রাম আমাদের শেখায় সম্মান, অধ্যবসায় ও শিকড়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের মূল্য। তাদের জীবন ও সংস্কৃতির প্রতি রয়েছে আন্তরিক শ্রদ্ধা।


দৈনিক লাল বার্তা

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা