দৈনিক লাল বার্তা

আট সন্তান হারানোর শোক বুকে, অনাহারে দিন কাটে অনীল-সাগরিকার



আট সন্তান হারানোর শোক বুকে, অনাহারে দিন কাটে অনীল-সাগরিকার

জীবনের শেষ বয়সে এসে যেখানে একটু শান্তি, নিরাপদ আশ্রয় আর দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা পাওয়ার কথা, সেখানে অনাহার আর অনিশ্চয়তাই নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উষাইকোল গ্রামের বৃদ্ধ অনীল চন্দ্র সিংহ (৮০) ও তাঁর স্ত্রী সাগরিকা সিংহের (৭০) জীবনে। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে আট সন্তানের জন্ম হলেও কেউ বেঁচে থাকেনি। সন্তান হারানোর সেই বেদনা বুকে নিয়েই এখন নিঃস্ব অবস্থায় দিন কাটছে এই বৃদ্ধ দম্পতির।

দেশীগ্রাম ইউনিয়নের উষাইকোল গ্রামের বাসিন্দা অনীল চন্দ্র সিংহ তিলোক চন্দ্র সিংহের ছেলে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনীল ও সাগরিকার সংসারে একে একে আট সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁদের পিছু ছাড়েনি। জন্মের মাত্র দুই থেকে চার দিনের মধ্যেই একে একে মারা যায় সব সন্তান। সন্তানদের মুখে বাবা-মায়ের ডাক শোনার আগেই হারিয়ে ফেলেন তাঁরা। দীর্ঘদিনের সেই শোক আজও তাঁদের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে।

সন্তানহীন এই দম্পতির বার্ধক্যেও পাশে নেই কোনো সন্তান। বয়সের ভারে অনীল ও সাগরিকা এখন অনেকটাই কর্মক্ষমতাহীন। ফলে নিজেদের খাবার জোগাড় করাটাও তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক দিনই ঠিকমতো খাবার জোটে না। কখনো অর্ধাহারে, কখনো অনাহারেই দিন পার করতে হয় তাঁদের।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে খাদ্যের পাশাপাশি চিকিৎসা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তাঁরা। বয়সজনিত নানা প্রয়োজন মেটানো, ওষুধ কেনা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ—সবকিছুই যেন তাঁদের সামর্থ্যের বাইরে। আয়-রোজগারের কোনো স্থায়ী উৎস না থাকায় অন্যের সহায়তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করতে হচ্ছে।

একদিকে আট সন্তানকে হারানোর অসহনীয় স্মৃতি, অন্যদিকে বার্ধক্যের অসহায়ত্ব—দুইয়ে মিলে অনীল-সাগরিকার জীবন যেন দীর্ঘ এক অপেক্ষার নাম। তাঁদের পাশে নিয়মিতভাবে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। ফলে কখনো প্রতিবেশী কিংবা পরিচিতজনের সহায়তায় খাবার মিললেও তা স্থায়ী সমাধান নয়।

স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, এমন অসহায় বৃদ্ধ দম্পতির বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তাঁরা কী ধরনের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, তা যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়মিত খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা ও নিরাপদভাবে বসবাসের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

এলাকাবাসী সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতি অনীল-সাগরিকা দম্পতির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, জীবনের এই শেষ সময়ে অন্তত দুবেলা খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও একটু নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তা পাবেন তাঁরা।

এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, “এ বিষয়ে আমি জানতে পেরেছি। আমরা খোঁজ নিয়ে তাঁদের সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”

আট সন্তানকে হারানোর শোকের ভার আর বার্ধক্যের অসহায়ত্ব নিয়ে দিন কাটানো অনীল-সাগরিকার জীবনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানবিক সহায়তা। জীবনের শেষ দিনগুলো যেন অনাহার ও অনিশ্চয়তায় না কাটে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক লাল বার্তা

সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬


আট সন্তান হারানোর শোক বুকে, অনাহারে দিন কাটে অনীল-সাগরিকার

প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬

featured Image


জীবনের শেষ বয়সে এসে যেখানে একটু শান্তি, নিরাপদ আশ্রয় আর দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা পাওয়ার কথা, সেখানে অনাহার আর অনিশ্চয়তাই নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উষাইকোল গ্রামের বৃদ্ধ অনীল চন্দ্র সিংহ (৮০) ও তাঁর স্ত্রী সাগরিকা সিংহের (৭০) জীবনে। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে আট সন্তানের জন্ম হলেও কেউ বেঁচে থাকেনি। সন্তান হারানোর সেই বেদনা বুকে নিয়েই এখন নিঃস্ব অবস্থায় দিন কাটছে এই বৃদ্ধ দম্পতির।

দেশীগ্রাম ইউনিয়নের উষাইকোল গ্রামের বাসিন্দা অনীল চন্দ্র সিংহ তিলোক চন্দ্র সিংহের ছেলে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনীল ও সাগরিকার সংসারে একে একে আট সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁদের পিছু ছাড়েনি। জন্মের মাত্র দুই থেকে চার দিনের মধ্যেই একে একে মারা যায় সব সন্তান। সন্তানদের মুখে বাবা-মায়ের ডাক শোনার আগেই হারিয়ে ফেলেন তাঁরা। দীর্ঘদিনের সেই শোক আজও তাঁদের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে।

সন্তানহীন এই দম্পতির বার্ধক্যেও পাশে নেই কোনো সন্তান। বয়সের ভারে অনীল ও সাগরিকা এখন অনেকটাই কর্মক্ষমতাহীন। ফলে নিজেদের খাবার জোগাড় করাটাও তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক দিনই ঠিকমতো খাবার জোটে না। কখনো অর্ধাহারে, কখনো অনাহারেই দিন পার করতে হয় তাঁদের।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে খাদ্যের পাশাপাশি চিকিৎসা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তাঁরা। বয়সজনিত নানা প্রয়োজন মেটানো, ওষুধ কেনা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ—সবকিছুই যেন তাঁদের সামর্থ্যের বাইরে। আয়-রোজগারের কোনো স্থায়ী উৎস না থাকায় অন্যের সহায়তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করতে হচ্ছে।

একদিকে আট সন্তানকে হারানোর অসহনীয় স্মৃতি, অন্যদিকে বার্ধক্যের অসহায়ত্ব—দুইয়ে মিলে অনীল-সাগরিকার জীবন যেন দীর্ঘ এক অপেক্ষার নাম। তাঁদের পাশে নিয়মিতভাবে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। ফলে কখনো প্রতিবেশী কিংবা পরিচিতজনের সহায়তায় খাবার মিললেও তা স্থায়ী সমাধান নয়।

স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, এমন অসহায় বৃদ্ধ দম্পতির বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তাঁরা কী ধরনের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, তা যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়মিত খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা ও নিরাপদভাবে বসবাসের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

এলাকাবাসী সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতি অনীল-সাগরিকা দম্পতির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, জীবনের এই শেষ সময়ে অন্তত দুবেলা খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও একটু নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তা পাবেন তাঁরা।

এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, “এ বিষয়ে আমি জানতে পেরেছি। আমরা খোঁজ নিয়ে তাঁদের সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”

আট সন্তানকে হারানোর শোকের ভার আর বার্ধক্যের অসহায়ত্ব নিয়ে দিন কাটানো অনীল-সাগরিকার জীবনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানবিক সহায়তা। জীবনের শেষ দিনগুলো যেন অনাহার ও অনিশ্চয়তায় না কাটে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।


দৈনিক লাল বার্তা

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা