একসময় নতুন বাংলা সিনেমা মুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়লেই উৎসবের আমেজ নেমে আসত সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায়। সিনেমা হলের সামনে দীর্ঘ লাইন, মাইকে সিনেমার গানের প্রচারণা, হাতে হাতে রঙিন পোস্টার আর দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। ঈদ, পূজা কিংবা বিশেষ দিবসকে ঘিরে সিনেমা হলগুলো হয়ে উঠত হাজারো মানুষের মিলনমেলা। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর স্রোতে সেই সোনালি দিন এখন কেবলই স্মৃতি। একসময় বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রায়গঞ্জের ছয়টি সিনেমা হল আজ বিলুপ্ত, হারিয়ে যাচ্ছে এক গৌরবময় সাংস্কৃতিক ইতিহাস।
যেখানে ছিল প্রাণের স্পন্দন
নব্বইয়ের দশক ও তার পূর্ববর্তী সময়ে উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও জনপদে গড়ে উঠেছিল ছয়টি সিনেমা হল। এগুলো হলো—চান্দাইকোনা (পাবনা বাজার) এলাকার ‘মুক্তি সিনেমা হল’, ধানগড়ার ‘কামনা হল’, নিমগাছীর ‘করতোয়া হল’, সলঙ্গার ‘কানন হল’ ও ‘প্রেয়শী হল’, এবং ভূঁইয়াগাতীর ‘বন্ধন হল’। এসব হলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এক প্রাণবন্ত পরিবেশ, যা ছিল সাধারণ মানুষের অবসর বিনোদনের প্রধান ঠিকানা।
বিশেষ করে মহাসড়কের পাশে অবস্থিত চান্দাইকোনার ‘মুক্তি সিনেমা হল’ ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, অনেকে এখনো এলাকাটিকে ‘মুক্তি সিনেমা হলের রোড’ নামেই চেনেন। নতুন বাংলা কিংবা বিদেশি চলচ্চিত্র মুক্তি পেলেই শত শত দর্শকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত হল প্রাঙ্গণ। টিকিট সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা ছিল সে সময়ের এক অবিচ্ছেদ্য অভিজ্ঞতা।
স্মৃতির পাতায় সমাজ ও সংস্কৃতি
প্রবীণদের মতে, এই সিনেমা হলগুলো কেবল চলচ্চিত্র প্রদর্শনের স্থান ছিল না; ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের কেন্দ্র। আশপাশের উপজেলা থেকেও পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ সিনেমা দেখতে আসতেন। এতে স্থানীয় বাজারগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হতো, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ত ব্যবসা-বাণিজ্যে। নিমগাছীর ‘হলপট্টি’ নামটির মধ্যেই আজও লুকিয়ে আছে সেই সময়ের গৌরবময় ইতিহাসের স্বাক্ষর।
কেন এই নীরবতা?
সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরন। টেলিভিশন, স্যাটেলাইট চ্যানেল, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সহজলভ্যতায় সিনেমা হলের দর্শক দ্রুত কমতে থাকে। লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে একে একে বন্ধ হয়ে যায় রায়গঞ্জের সব কটি হল। বর্তমানে অধিকাংশ হল ভবন অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, আবার কিছু পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। নেই টিকিট কাউন্টারের কোলাহল, নেই নতুন সিনেমার পোস্টার সাঁটানোর ব্যস্ততা।
নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা ও সচেতনতা
আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে এসব হলের অস্তিত্ব কেবল গল্পের মতো। নিমগাছী ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, “উপজেলায় ছয়টি সিনেমা হল ছিল, তা আগে জানতাম না। এসব স্থাপনা ও ইতিহাস সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারে এখানকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কেমন ছিল।”
এ বিষয়ে স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও গণমাধ্যমকর্মী দীপক কুমার বলেন, “একটি সিনেমা দেখতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসতেন। সেই সুস্থ বিনোদনের দিনগুলো আজ কেবল স্মৃতিতে বন্দি।”
ধানগড়া মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক সাজেদুল আলম বলেন, “এখন উপজেলা পর্যায়ে নয়, জেলা শহরেও সিনেমা হল খুঁজে পাওয়া কঠিন। বর্তমান বাস্তবতায় বড় বড় মার্কেটে আধুনিক সিনেপ্লেক্স গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।”
উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সাবেক সহসভাপতি শংকর কুমার দাস মনে করেন, শুধু হল থাকলেই হবে না, প্রয়োজন ভালো গল্পনির্ভর মানসম্মত সিনেমা। তাঁর ভাষায়, “সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিনোদনের একটি বড় ক্ষেত্র হারিয়ে গেছে। আবার দর্শকদের হলমুখী করতে চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”
রায়গঞ্জের মাটি ও মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই সিনেমা হলগুলো আজ কেবলই নীরব সাক্ষী। স্থানীয়দের মতে, এগুলোকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ ও তথ্যফলক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা রায়গঞ্জের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।

বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬
একসময় নতুন বাংলা সিনেমা মুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়লেই উৎসবের আমেজ নেমে আসত সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায়। সিনেমা হলের সামনে দীর্ঘ লাইন, মাইকে সিনেমার গানের প্রচারণা, হাতে হাতে রঙিন পোস্টার আর দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। ঈদ, পূজা কিংবা বিশেষ দিবসকে ঘিরে সিনেমা হলগুলো হয়ে উঠত হাজারো মানুষের মিলনমেলা। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর স্রোতে সেই সোনালি দিন এখন কেবলই স্মৃতি। একসময় বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রায়গঞ্জের ছয়টি সিনেমা হল আজ বিলুপ্ত, হারিয়ে যাচ্ছে এক গৌরবময় সাংস্কৃতিক ইতিহাস।
যেখানে ছিল প্রাণের স্পন্দন
নব্বইয়ের দশক ও তার পূর্ববর্তী সময়ে উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও জনপদে গড়ে উঠেছিল ছয়টি সিনেমা হল। এগুলো হলো—চান্দাইকোনা (পাবনা বাজার) এলাকার ‘মুক্তি সিনেমা হল’, ধানগড়ার ‘কামনা হল’, নিমগাছীর ‘করতোয়া হল’, সলঙ্গার ‘কানন হল’ ও ‘প্রেয়শী হল’, এবং ভূঁইয়াগাতীর ‘বন্ধন হল’। এসব হলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এক প্রাণবন্ত পরিবেশ, যা ছিল সাধারণ মানুষের অবসর বিনোদনের প্রধান ঠিকানা।
বিশেষ করে মহাসড়কের পাশে অবস্থিত চান্দাইকোনার ‘মুক্তি সিনেমা হল’ ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, অনেকে এখনো এলাকাটিকে ‘মুক্তি সিনেমা হলের রোড’ নামেই চেনেন। নতুন বাংলা কিংবা বিদেশি চলচ্চিত্র মুক্তি পেলেই শত শত দর্শকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত হল প্রাঙ্গণ। টিকিট সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা ছিল সে সময়ের এক অবিচ্ছেদ্য অভিজ্ঞতা।
স্মৃতির পাতায় সমাজ ও সংস্কৃতি
প্রবীণদের মতে, এই সিনেমা হলগুলো কেবল চলচ্চিত্র প্রদর্শনের স্থান ছিল না; ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের কেন্দ্র। আশপাশের উপজেলা থেকেও পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ সিনেমা দেখতে আসতেন। এতে স্থানীয় বাজারগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হতো, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ত ব্যবসা-বাণিজ্যে। নিমগাছীর ‘হলপট্টি’ নামটির মধ্যেই আজও লুকিয়ে আছে সেই সময়ের গৌরবময় ইতিহাসের স্বাক্ষর।
কেন এই নীরবতা?
সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরন। টেলিভিশন, স্যাটেলাইট চ্যানেল, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সহজলভ্যতায় সিনেমা হলের দর্শক দ্রুত কমতে থাকে। লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে একে একে বন্ধ হয়ে যায় রায়গঞ্জের সব কটি হল। বর্তমানে অধিকাংশ হল ভবন অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, আবার কিছু পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। নেই টিকিট কাউন্টারের কোলাহল, নেই নতুন সিনেমার পোস্টার সাঁটানোর ব্যস্ততা।
নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা ও সচেতনতা
আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে এসব হলের অস্তিত্ব কেবল গল্পের মতো। নিমগাছী ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, “উপজেলায় ছয়টি সিনেমা হল ছিল, তা আগে জানতাম না। এসব স্থাপনা ও ইতিহাস সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারে এখানকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কেমন ছিল।”
এ বিষয়ে স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও গণমাধ্যমকর্মী দীপক কুমার বলেন, “একটি সিনেমা দেখতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসতেন। সেই সুস্থ বিনোদনের দিনগুলো আজ কেবল স্মৃতিতে বন্দি।”
ধানগড়া মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক সাজেদুল আলম বলেন, “এখন উপজেলা পর্যায়ে নয়, জেলা শহরেও সিনেমা হল খুঁজে পাওয়া কঠিন। বর্তমান বাস্তবতায় বড় বড় মার্কেটে আধুনিক সিনেপ্লেক্স গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।”
উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সাবেক সহসভাপতি শংকর কুমার দাস মনে করেন, শুধু হল থাকলেই হবে না, প্রয়োজন ভালো গল্পনির্ভর মানসম্মত সিনেমা। তাঁর ভাষায়, “সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিনোদনের একটি বড় ক্ষেত্র হারিয়ে গেছে। আবার দর্শকদের হলমুখী করতে চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”
রায়গঞ্জের মাটি ও মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই সিনেমা হলগুলো আজ কেবলই নীরব সাক্ষী। স্থানীয়দের মতে, এগুলোকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ ও তথ্যফলক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা রায়গঞ্জের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।

আপনার মতামত লিখুন