ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নথিপত্রহীন মুসলিম বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিতাড়ন অভিযান শুরু হয়েছে। রাজ্যের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে পরিচালিত এই অভিযানে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৮০০ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং আরও ৮৩৬ জন আটক কেন্দ্রে রয়েছেন। অভিযানটি সীমান্তের উভয় পাশে মানবিক সংকট তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যে এই অভিযান শুরু হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেছেন যে আটক কেন্দ্রে থাকা বাকিদেরও দ্রুত নির্বাসিত করা হবে। রাজ্য সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, এই অভিযান শুধুমাত্র মুসলিম অভিবাসীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একটি বিতর্কিত সাংবিধানিক সংশোধনীর আওতায় হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মের অভিবাসীরা এর বাইরে থাকবেন।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ জন নথিবিহীন অভিবাসী আসছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সেখানে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে জাতীয়তা যাচাই করা হচ্ছে। পানীয় জলের সংকটসহ প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতার মধ্যে শত শত মানুষ সেখানে অপেক্ষা করছেন।
খুলনার সাতক্ষীরার বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রি রাইসুল ইসলাম জানান, দুই বছর আগে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য প্রায় ২৫০ ডলার খরচ করে সপরিবারে কলকাতায় আসেন তিনি। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয়দের হামলার আশঙ্কায় তিনি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। একই পরিস্থিতির কথা জানান ৪২ বছর বয়সী নির্মাণ শ্রমিক মিরাজুল গাজী, যিনি পাঁচ বছর ধরে কলকাতায় কাজ করছিলেন। বাড়িওয়ালার উচ্ছেদ নোটিশ ও হামলার ভয়ে তিনি স্ত্রী সাবিনা ও ছেলে নায়েমকে নিয়ে দেশে ফেরার পথ ধরেন।
এই অভিযান রাজ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ ভারতীয় মুসলমানদের একাংশের মধ্যেও নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বিদেশি নাগরিকদের অধিকার সীমিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ আটককৃতদের আদালতে না নিয়েই সরাসরি নির্বাসনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এর আগে ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে প্রতিবেশী আসাম রাজ্যে একই ধরনের অভিযানে বহু ভারতীয় মুসলমানকে পুশব্যাক করা হয়েছিল।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক এলেইন পিয়ারসন এই নির্বাসনকে অবৈধ ও অনৈতিক আখ্যা দিয়ে আটককৃতদের আইনি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। ভারতীয় মানবাধিকার কর্মী তিস্তা সেতলবাদ অভিযোগ করেন, সরকার নিজস্ব নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে মানুষকে আটক কেন্দ্রে বন্দি করছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শামা ওবাইদ ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, নিয়ম মেনে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে নয়াদিল্লিকে ইতিমধ্যে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং এই দমনপীড়ন দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, গত ৪ জুন থেকে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর অন্তত ১৮টি পুশব্যাকের চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে। সংকট নিরসনে সোমবার থেকে দুই দেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর মধ্যে তিন দিনব্যাপী জরুরি আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতের নিজস্ব আইন রয়েছে। তিনি আরও জানান, ২ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজন বাংলাদেশির তথ্য জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য ঢাকার কাছে পাঠানো হয়েছে, যা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন।
সূত্র: আল জাজিরা

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নথিপত্রহীন মুসলিম বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিতাড়ন অভিযান শুরু হয়েছে। রাজ্যের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে পরিচালিত এই অভিযানে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৮০০ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং আরও ৮৩৬ জন আটক কেন্দ্রে রয়েছেন। অভিযানটি সীমান্তের উভয় পাশে মানবিক সংকট তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যে এই অভিযান শুরু হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেছেন যে আটক কেন্দ্রে থাকা বাকিদেরও দ্রুত নির্বাসিত করা হবে। রাজ্য সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, এই অভিযান শুধুমাত্র মুসলিম অভিবাসীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একটি বিতর্কিত সাংবিধানিক সংশোধনীর আওতায় হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মের অভিবাসীরা এর বাইরে থাকবেন।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ জন নথিবিহীন অভিবাসী আসছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সেখানে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে জাতীয়তা যাচাই করা হচ্ছে। পানীয় জলের সংকটসহ প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতার মধ্যে শত শত মানুষ সেখানে অপেক্ষা করছেন।
খুলনার সাতক্ষীরার বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রি রাইসুল ইসলাম জানান, দুই বছর আগে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য প্রায় ২৫০ ডলার খরচ করে সপরিবারে কলকাতায় আসেন তিনি। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয়দের হামলার আশঙ্কায় তিনি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। একই পরিস্থিতির কথা জানান ৪২ বছর বয়সী নির্মাণ শ্রমিক মিরাজুল গাজী, যিনি পাঁচ বছর ধরে কলকাতায় কাজ করছিলেন। বাড়িওয়ালার উচ্ছেদ নোটিশ ও হামলার ভয়ে তিনি স্ত্রী সাবিনা ও ছেলে নায়েমকে নিয়ে দেশে ফেরার পথ ধরেন।
এই অভিযান রাজ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ ভারতীয় মুসলমানদের একাংশের মধ্যেও নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বিদেশি নাগরিকদের অধিকার সীমিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ আটককৃতদের আদালতে না নিয়েই সরাসরি নির্বাসনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এর আগে ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে প্রতিবেশী আসাম রাজ্যে একই ধরনের অভিযানে বহু ভারতীয় মুসলমানকে পুশব্যাক করা হয়েছিল।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক এলেইন পিয়ারসন এই নির্বাসনকে অবৈধ ও অনৈতিক আখ্যা দিয়ে আটককৃতদের আইনি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। ভারতীয় মানবাধিকার কর্মী তিস্তা সেতলবাদ অভিযোগ করেন, সরকার নিজস্ব নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে মানুষকে আটক কেন্দ্রে বন্দি করছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শামা ওবাইদ ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, নিয়ম মেনে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে নয়াদিল্লিকে ইতিমধ্যে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং এই দমনপীড়ন দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, গত ৪ জুন থেকে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর অন্তত ১৮টি পুশব্যাকের চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে। সংকট নিরসনে সোমবার থেকে দুই দেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর মধ্যে তিন দিনব্যাপী জরুরি আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতের নিজস্ব আইন রয়েছে। তিনি আরও জানান, ২ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজন বাংলাদেশির তথ্য জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য ঢাকার কাছে পাঠানো হয়েছে, যা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন।
সূত্র: আল জাজিরা

আপনার মতামত লিখুন