দৈনিক লাল বার্তা

চাতালে বিষাক্ত ঝুট পোড়ানো, ধোঁয়ায় বিপন্ন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য



চাতালে বিষাক্ত ঝুট পোড়ানো, ধোঁয়ায় বিপন্ন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ঘুড়কা এলাকায় কয়েকটি চাউল কলে (ধান ছাঁটাইয়ের চাতাল) নিষিদ্ধ ঝুট (গার্মেন্টস পণ্যের উচ্ছিষ্টাংশ) পুড়িয়ে ধান সিদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে। এতে সৃষ্ট বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় একদিকে যেমন তীব্র পরিবেশ দূষণ ঘটছে, অন্যদিকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এই চরম ভোগান্তি ও অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে গত ৪ জুন সলঙ্গা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দা লতিফ সরকার।বসতঘরে কালো কালি, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য লিখিত অভিযোগে লতিফ সরকার উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে ঘুড়কা এলাকার 'শিকদার চাউল কল' ও 'শাপলা চাউল কল'-এ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিষিদ্ধ ঝুট পুড়িয়ে ধান সিদ্ধ করা হচ্ছে। চাতালগুলোর নিকটবর্তী এলাকায় তার বাড়ি হওয়ায় বিষাক্ত ধোঁয়া ও ছাই সরাসরি বসতঘরে প্রবেশ করছে। ফলে ঘরের আসবাবপত্র, খাবার ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র সবসময় কালো কালিতে ঢেকে থাকছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন:

"আমার বৃদ্ধ মা ইতোমধ্যে এই বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে মারাত্মক শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চাতাল মালিকদের বারবার ঝুট পোড়ানো বন্ধ করার অনুরোধ জানানো হলেও তারা তা আমলে নেননি। উল্টো আমাকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে।"

চাতালগুলোতে ঝুট পোড়ানোর সময় সৃষ্ট ঘন কালো ধোঁয়ায় আশপাশের পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। এতে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যও চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

ঝুট পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও চাতাল মালিকরা তা প্রকাশ্যেই করে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এক চাতাল ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম অকপটে নিজের দোষ স্বীকার করে বলেন, “ঝুট পোড়ানো যে নিষিদ্ধ, তা আমরা জানি। তবে আশপাশের অনেকেই এটি ব্যবহার করেন, তাই আমরাও ব্যবহার করছি।”

স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব

মেডিকেল বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ কর্মকর্তারা এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হিসেবে দেখছেন।

রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আ ফ ম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “ঝুট পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট কালো ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ফুসফুসের ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

সিরাজগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তুহিন আলম জানান, “অভিযোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। দ্রুতই তদন্ত চালানো হবে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট চাতালগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

সলঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসলাম আলী লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করতে দ্রুতই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবে। তদন্ত সাপেক্ষে পরিবেশ বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, প্রশাসনের সদিচ্ছা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমেই কেবল এই বিষাক্ত ধোঁয়ার কবল থেকে ঘুড়কা এলাকার পরিবেশ ও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক লাল বার্তা

শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬


চাতালে বিষাক্ত ঝুট পোড়ানো, ধোঁয়ায় বিপন্ন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬

featured Image



সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ঘুড়কা এলাকায় কয়েকটি চাউল কলে (ধান ছাঁটাইয়ের চাতাল) নিষিদ্ধ ঝুট (গার্মেন্টস পণ্যের উচ্ছিষ্টাংশ) পুড়িয়ে ধান সিদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে। এতে সৃষ্ট বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় একদিকে যেমন তীব্র পরিবেশ দূষণ ঘটছে, অন্যদিকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


এই চরম ভোগান্তি ও অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে গত ৪ জুন সলঙ্গা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দা লতিফ সরকার।বসতঘরে কালো কালি, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য লিখিত অভিযোগে লতিফ সরকার উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে ঘুড়কা এলাকার 'শিকদার চাউল কল' ও 'শাপলা চাউল কল'-এ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিষিদ্ধ ঝুট পুড়িয়ে ধান সিদ্ধ করা হচ্ছে। চাতালগুলোর নিকটবর্তী এলাকায় তার বাড়ি হওয়ায় বিষাক্ত ধোঁয়া ও ছাই সরাসরি বসতঘরে প্রবেশ করছে। ফলে ঘরের আসবাবপত্র, খাবার ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র সবসময় কালো কালিতে ঢেকে থাকছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন:

"আমার বৃদ্ধ মা ইতোমধ্যে এই বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে মারাত্মক শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চাতাল মালিকদের বারবার ঝুট পোড়ানো বন্ধ করার অনুরোধ জানানো হলেও তারা তা আমলে নেননি। উল্টো আমাকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে।"



চাতালগুলোতে ঝুট পোড়ানোর সময় সৃষ্ট ঘন কালো ধোঁয়ায় আশপাশের পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। এতে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যও চরম হুমকির মুখে পড়েছে।


ঝুট পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও চাতাল মালিকরা তা প্রকাশ্যেই করে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এক চাতাল ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম অকপটে নিজের দোষ স্বীকার করে বলেন, “ঝুট পোড়ানো যে নিষিদ্ধ, তা আমরা জানি। তবে আশপাশের অনেকেই এটি ব্যবহার করেন, তাই আমরাও ব্যবহার করছি।”

স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব

মেডিকেল বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ কর্মকর্তারা এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হিসেবে দেখছেন।



রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আ ফ ম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “ঝুট পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট কালো ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ফুসফুসের ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”



সিরাজগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তুহিন আলম জানান, “অভিযোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। দ্রুতই তদন্ত চালানো হবে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট চাতালগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”



সলঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসলাম আলী লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করতে দ্রুতই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবে। তদন্ত সাপেক্ষে পরিবেশ বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, প্রশাসনের সদিচ্ছা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমেই কেবল এই বিষাক্ত ধোঁয়ার কবল থেকে ঘুড়কা এলাকার পরিবেশ ও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব।


দৈনিক লাল বার্তা

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা