দৈনিক লাল বার্তা

নীরবে ফিরছে পুনর্ব্যবহৃত সিম, ঝুঁকিতে নতুন গ্রাহক



নীরবে ফিরছে পুনর্ব্যবহৃত সিম, ঝুঁকিতে নতুন গ্রাহক

দেশে মোবাইল অপারেটরদের পুনর্ব্যবহৃত সিম নীতির কারণে নতুন গ্রাহকেরা অজান্তেই আগের ব্যবহারকারীর বিভিন্ন ডিজিটাল, আর্থিক ও আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ছেন। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের নীতিমালা অনুযায়ী ১১ মাস নিষ্ক্রিয় থাকা সিম পুনরায় বিক্রি করা হলেও নম্বরের সঙ্গে যুক্ত পূর্ববর্তী ডিজিটাল পরিচয় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হওয়ায় এ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

মেহেরপুরে এক গণমাধ্যমকর্মী তিন মাস আগে একটি নতুন সিম ক্রয় করে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধন করেন। পরে তিনি অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে অভিযোগ ও অর্থ দাবির ফোন পেতে থাকেন। বিষয়টি অনুসন্ধানে জানা যায়, নম্বরটির আগের ব্যবহারকারীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

রাজধানীর মিরপুরে এক চাকরিজীবী জানান, নতুন সিম নেওয়ার পর তার নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপের ওটিপি আসতে থাকে। এতে বোঝা যায়, পূর্ববর্তী ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট তখনও সক্রিয় ছিল। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গার দুই নারী, যারা পুরোনো নম্বর ব্যবহারের কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত ফোনকলের শিকার হয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, পুনর্ব্যবহৃত সিমে আগের ব্যবহারকারীর ঋণসংক্রান্ত ফোন, বিদ্যুৎ বিলের তাগাদা, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যোগাযোগও আসছে। এতে নতুন ব্যবহারকারীরা বিব্রতকর পরিস্থিতির পাশাপাশি সম্ভাব্য আইনি ঝুঁকিতেও পড়ছেন।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, কোনো সিম ১১ মাস নিষ্ক্রিয় থাকলে সেটি ডি-অ্যাকটিভেটেড হয় এবং অনুমোদন সাপেক্ষে অপারেটররা পুনরায় বিক্রি করতে পারে। পূর্বে এই সময়সীমা ছিল ১৮ মাস। দেশে কার্যরত গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক, এয়ারটেল ও টেলিটক নিয়মিতভাবে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে।

গ্রামীণফোনের কাস্টমার সার্ভিস বিভাগের শাহরিয়ার তালুকদার জানান, সিম পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিটিআরসির নির্দেশনা মেনে কাজ করা হয় এবং পূর্ববর্তী গ্রাহকের এনআইডি ও তথ্য সিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। তবে ডিজিটাল ট্রেস সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রবি কর্তৃপক্ষও জানায়, তাদের কার্যক্রম নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এয়ারটেল জানায়, বিষয়টি অভ্যন্তরীণ নীতির আওতায় থাকায় বিস্তারিত প্রকাশযোগ্য নয়। বাংলালিংক ও টেলিটক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

বিটিআরসির উপপরিচালক ফারহান আলম বলেন, সিম পুনর্বিক্রির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ বাধ্যতামূলক এবং লঙ্ঘন হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি জানান, অপারেটররা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গ্রাহক তথ্য সংরক্ষণ করে এবং পরবর্তীতে তা মুছে ফেলা হয়। তবে বর্তমানে নম্বর পুনর্ব্যবহারের আগে কোনো কেন্দ্রীয় ইতিহাস যাচাই ব্যবস্থা নেই।

বিটিআরসির কর্মকর্তারা জানান, রিসাইকেল সিম থেকে ডিজিটাল ট্রেস পুরোপুরি মুছে ফেলা প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। তবুও গ্রাহক সমস্যায় পড়লে অপারেটরদের সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে সিম পুনর্ব্যবহারের আগে গ্রাহককে অবহিত করার নির্দেশনা থাকলেও তা সব ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক আফজালুর রশিদ বলেন, প্রতারক চক্র অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে পুরোনো নম্বর ব্যবহার করে, কারণ এতে মানুষের আস্থা সহজে অর্জন করা যায়। ফলে প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ে এবং তদন্ত প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল নম্বর এখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এর পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় আরও সতর্কতা প্রয়োজন। তারা কেন্দ্রীয় নম্বর ইতিহাস যাচাই ব্যবস্থা চালু, ডিজিটাল ডিলিঙ্কিং বাধ্যতামূলক করা এবং গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুনর্ব্যবহৃত সিম ব্যবস্থাপনা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি গ্রাহকের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক লাল বার্তা

শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬


নীরবে ফিরছে পুনর্ব্যবহৃত সিম, ঝুঁকিতে নতুন গ্রাহক

প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬

featured Image



দেশে মোবাইল অপারেটরদের পুনর্ব্যবহৃত সিম নীতির কারণে নতুন গ্রাহকেরা অজান্তেই আগের ব্যবহারকারীর বিভিন্ন ডিজিটাল, আর্থিক ও আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ছেন। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের নীতিমালা অনুযায়ী ১১ মাস নিষ্ক্রিয় থাকা সিম পুনরায় বিক্রি করা হলেও নম্বরের সঙ্গে যুক্ত পূর্ববর্তী ডিজিটাল পরিচয় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হওয়ায় এ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।


মেহেরপুরে এক গণমাধ্যমকর্মী তিন মাস আগে একটি নতুন সিম ক্রয় করে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধন করেন। পরে তিনি অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে অভিযোগ ও অর্থ দাবির ফোন পেতে থাকেন। বিষয়টি অনুসন্ধানে জানা যায়, নম্বরটির আগের ব্যবহারকারীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।


রাজধানীর মিরপুরে এক চাকরিজীবী জানান, নতুন সিম নেওয়ার পর তার নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপের ওটিপি আসতে থাকে। এতে বোঝা যায়, পূর্ববর্তী ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট তখনও সক্রিয় ছিল। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গার দুই নারী, যারা পুরোনো নম্বর ব্যবহারের কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত ফোনকলের শিকার হয়েছেন।


ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, পুনর্ব্যবহৃত সিমে আগের ব্যবহারকারীর ঋণসংক্রান্ত ফোন, বিদ্যুৎ বিলের তাগাদা, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যোগাযোগও আসছে। এতে নতুন ব্যবহারকারীরা বিব্রতকর পরিস্থিতির পাশাপাশি সম্ভাব্য আইনি ঝুঁকিতেও পড়ছেন।


বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, কোনো সিম ১১ মাস নিষ্ক্রিয় থাকলে সেটি ডি-অ্যাকটিভেটেড হয় এবং অনুমোদন সাপেক্ষে অপারেটররা পুনরায় বিক্রি করতে পারে। পূর্বে এই সময়সীমা ছিল ১৮ মাস। দেশে কার্যরত গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক, এয়ারটেল ও টেলিটক নিয়মিতভাবে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে।


গ্রামীণফোনের কাস্টমার সার্ভিস বিভাগের শাহরিয়ার তালুকদার জানান, সিম পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিটিআরসির নির্দেশনা মেনে কাজ করা হয় এবং পূর্ববর্তী গ্রাহকের এনআইডি ও তথ্য সিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। তবে ডিজিটাল ট্রেস সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।


রবি কর্তৃপক্ষও জানায়, তাদের কার্যক্রম নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এয়ারটেল জানায়, বিষয়টি অভ্যন্তরীণ নীতির আওতায় থাকায় বিস্তারিত প্রকাশযোগ্য নয়। বাংলালিংক ও টেলিটক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।


বিটিআরসির উপপরিচালক ফারহান আলম বলেন, সিম পুনর্বিক্রির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ বাধ্যতামূলক এবং লঙ্ঘন হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি জানান, অপারেটররা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গ্রাহক তথ্য সংরক্ষণ করে এবং পরবর্তীতে তা মুছে ফেলা হয়। তবে বর্তমানে নম্বর পুনর্ব্যবহারের আগে কোনো কেন্দ্রীয় ইতিহাস যাচাই ব্যবস্থা নেই।


বিটিআরসির কর্মকর্তারা জানান, রিসাইকেল সিম থেকে ডিজিটাল ট্রেস পুরোপুরি মুছে ফেলা প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। তবুও গ্রাহক সমস্যায় পড়লে অপারেটরদের সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে সিম পুনর্ব্যবহারের আগে গ্রাহককে অবহিত করার নির্দেশনা থাকলেও তা সব ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না।


সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক আফজালুর রশিদ বলেন, প্রতারক চক্র অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে পুরোনো নম্বর ব্যবহার করে, কারণ এতে মানুষের আস্থা সহজে অর্জন করা যায়। ফলে প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ে এবং তদন্ত প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে ওঠে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল নম্বর এখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এর পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় আরও সতর্কতা প্রয়োজন। তারা কেন্দ্রীয় নম্বর ইতিহাস যাচাই ব্যবস্থা চালু, ডিজিটাল ডিলিঙ্কিং বাধ্যতামূলক করা এবং গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।


বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুনর্ব্যবহৃত সিম ব্যবস্থাপনা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি গ্রাহকের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


দৈনিক লাল বার্তা

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা