দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তীব্র তারল্য সংকট মোকাবিলায় আবারও নতুন টাকা ছাপিয়ে বিশেষ ঋণ সহায়তা দেওয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সবশেষ এক সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়েছে। সংকটে পড়া ১৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে এ পর্যন্ত সর্বমোট ৭৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন ও চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতায় গ্রাহকদের মধ্যে আমানত উত্তোলনের ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং ব্যাংকের নগদ জমা সংরক্ষণ বা সিআরআর বজায় রাখতে ব্যাংকটি ১০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা চাইলে ধাপে ধাপে তাদের ৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ১৬(৪)(ডি) ও ১৭(১)(বি) ধারার আওতায় ৯৫ দিনের জন্য সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে এই অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ তারল্য সহায়তার আওতায় সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, যার পরিমাণ ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এছাড়া এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ৮৪১ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি এবং ইসলামী ব্যাংক ৯ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। অন্যান্য ব্যাংকের মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংক ৫ হাজার ৪২০ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৫ হাজার কোটি, এবি ব্যাংক ৪ হাজার ২৭০ কোটি এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ৩ কোটি টাকা পেয়েছে। এর বাইরে কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংককেও বিভিন্ন অঙ্কের সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক তৌকিফ আহমেদ এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানান যে, ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠাই এই সহায়তার মূল লক্ষ্য। দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি ব্যাংককে দেওয়া এই সহায়তার প্রভাব খুব বড় হবে না বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে তাত্ত্বিকভাবে অর্থের সরবরাহ বাড়লে চাহিদাও বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে সীমিত পরিসরে এই সহায়তার বাস্তব প্রভাব সাধারণত সামান্য থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে. মুজেরী বিষয়টিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট বা শেষ আশ্রয়দাতার দায়িত্ব হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান যে এটি কোনো অনুদান নয়, বরং নির্ধারিত সময়ে পরিশোধযোগ্য ঋণ। দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে আসে বিধায় ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা পুরো খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও জানান যে ব্যাংকটির পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে একজন নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ ও পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের বড় কারণ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান যে নতুন অর্থ বাজারে প্রবেশ করলে তাত্ত্বিকভাবে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থাকে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংককে সহায়তা দেওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না। তিনি ডকট্রিন অব নেসেসিটি বা অপরিহার্যতার নীতির ভিত্তিতে এই সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার বেশি বিশেষ সহায়তা দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে গ্রাহকদের আস্থা ফিরলে এবং নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ হলে বাজারে অর্থের বাড়তি চাপ থাকবে না।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২২ সালের শেষ দিকে নির্দিষ্ট কিছু শিল্প গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলোতে ঋণ জালিয়াতির তথ্য প্রকাশের পর থেকে তারল্য সংকট শুরু হয়। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুরুতে টাকা ছাপিয়ে ঋণ না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করলেও, ব্যাংকিং খাতের বৃহত্তর স্থিতিশীলতা ও গ্রাহকদের আমানত ফেরত নিশ্চিত করতে পুনরায় এই বিশেষ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হলে তাদের সম্পদ বিক্রির অর্থ থেকে সবার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পাওনা পরিশোধ করতে হবে।

বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬
দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তীব্র তারল্য সংকট মোকাবিলায় আবারও নতুন টাকা ছাপিয়ে বিশেষ ঋণ সহায়তা দেওয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সবশেষ এক সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়েছে। সংকটে পড়া ১৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে এ পর্যন্ত সর্বমোট ৭৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন ও চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতায় গ্রাহকদের মধ্যে আমানত উত্তোলনের ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং ব্যাংকের নগদ জমা সংরক্ষণ বা সিআরআর বজায় রাখতে ব্যাংকটি ১০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা চাইলে ধাপে ধাপে তাদের ৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ১৬(৪)(ডি) ও ১৭(১)(বি) ধারার আওতায় ৯৫ দিনের জন্য সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে এই অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ তারল্য সহায়তার আওতায় সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, যার পরিমাণ ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এছাড়া এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ৮৪১ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি এবং ইসলামী ব্যাংক ৯ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। অন্যান্য ব্যাংকের মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংক ৫ হাজার ৪২০ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৫ হাজার কোটি, এবি ব্যাংক ৪ হাজার ২৭০ কোটি এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ৩ কোটি টাকা পেয়েছে। এর বাইরে কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংককেও বিভিন্ন অঙ্কের সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক তৌকিফ আহমেদ এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানান যে, ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠাই এই সহায়তার মূল লক্ষ্য। দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি ব্যাংককে দেওয়া এই সহায়তার প্রভাব খুব বড় হবে না বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে তাত্ত্বিকভাবে অর্থের সরবরাহ বাড়লে চাহিদাও বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে সীমিত পরিসরে এই সহায়তার বাস্তব প্রভাব সাধারণত সামান্য থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে. মুজেরী বিষয়টিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট বা শেষ আশ্রয়দাতার দায়িত্ব হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান যে এটি কোনো অনুদান নয়, বরং নির্ধারিত সময়ে পরিশোধযোগ্য ঋণ। দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে আসে বিধায় ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা পুরো খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও জানান যে ব্যাংকটির পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে একজন নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ ও পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের বড় কারণ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান যে নতুন অর্থ বাজারে প্রবেশ করলে তাত্ত্বিকভাবে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থাকে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংককে সহায়তা দেওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না। তিনি ডকট্রিন অব নেসেসিটি বা অপরিহার্যতার নীতির ভিত্তিতে এই সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার বেশি বিশেষ সহায়তা দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে গ্রাহকদের আস্থা ফিরলে এবং নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ হলে বাজারে অর্থের বাড়তি চাপ থাকবে না।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২২ সালের শেষ দিকে নির্দিষ্ট কিছু শিল্প গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলোতে ঋণ জালিয়াতির তথ্য প্রকাশের পর থেকে তারল্য সংকট শুরু হয়। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুরুতে টাকা ছাপিয়ে ঋণ না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করলেও, ব্যাংকিং খাতের বৃহত্তর স্থিতিশীলতা ও গ্রাহকদের আমানত ফেরত নিশ্চিত করতে পুনরায় এই বিশেষ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হলে তাদের সম্পদ বিক্রির অর্থ থেকে সবার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পাওনা পরিশোধ করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন