দৈনিক লাল বার্তা

কাজিপুরে গরমে বাড়ছে কাঁচা তালের শাঁসের কদর

 বাজারে উঠতে শুরু করেছে কাঁচা তাল। আম, জাম, কাঁঠাল ও লিচুর পাশাপাশি গরমের স্বস্তিদায়ক খাবার হিসেবে কাঁচা তালের শাঁসের চাহিদাও বাড়ছে। মিষ্টি স্বাদের মোহনীয় গন্ধে ভরা তালের শাঁস গ্রীষ্মের দুপুরে, প্রচণ্ড গরমে শরীর যখন ক্লান্ত, তখন খুব দ্রুত প্রশান্তি এনে দিতে পারে। গরমের এই দিনে সুমিষ্ট ও রসালো স্বাদের তালের শাঁস কে না চায়! তাল একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ফল। তালের শাঁসকে নারিকেলের মতোই পুষ্টিকর বলে বিবেচনা করা হয়।হঠাৎ করে দেশে ভ্যাপসা তাপদাহ শুরু হওয়ায় তালের শাঁসে প্রশান্তি খুঁজে ফিরছেন শিশু, কিশোর থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধরাও। তবে এ বছর তাপদাহে তালের শাঁসের কদর গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশি। তালের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় গ্রামগঞ্জ থেকে তাল সংগ্রহ করে সড়কের পাশে ও বাজারে অলিগলিতে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। তাতেই মানুষ ফরমালিনমুক্ত এ ফল খেয়ে তাপদাহের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন এক চিলতে প্রশান্তি।সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার সোনামুখী, চালিতাডাঙ্গা, মেঘাই, আলমপুর, সিমান্তবাজার, ঢেকুরিয়া, শিমুলদাইড়, হরিনাথ পুর, নাটুয়ারপাড়া, তেকানী, জর্জিরা, কুমারিয়াবাড়ী ও চরগিরিশ বাজারে রাস্তার মোড়ে ভ্যানগাড়িতে করে তালের শাঁস বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। সেই সঙ্গে দেখা গেছে ক্রেতাদেরও উপচে পড়া ভিড়।তালের শাঁস বিক্রেতা আবুল কালাম বলেন, তাল যখন কাঁচা থাকে, তখন বাজারে এটি পানিতাল বা তালের শাঁস হিসেবে বিক্রি হয়। প্রতিটি তালের শাঁস আকারভেদে ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হয়। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি তালের ভেতরে দুই থেকে তিনটি শাঁস থাকে। প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহু তালগাছ অকালে মরে যাচ্ছে। মেঘাই বাজারের তালের শাঁস বিক্রেতা নাজমুল হোসেন বলেন, ভ্যানে করে বিভিন্ন বাজারে এই ব্যবসা করি। দৈনিক ৫০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকারও ব্যবসা হয়।সোনামুখী বাজারের আলমগীর হোসেন বলেন, বাজারের অন্য অনেক ফলে ফরমালিন বা রাসায়নিক মেশানো থাকলেও তালের শাঁসে কোনো ফরমালিন বা রাসায়নিক মেশানো থাকে না। এতে শরীরের ক্লান্তিও দূর হয়। তাই এই গরমে আমি নিয়মিত তালের শাঁস খাই। সোনামুখী সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার প্রভাষক নাবিল ইসলাম বলেন, একসময় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তালগাছ ছিল। প্রতি বছর তালগাছ কেটে গৃহস্থালি কাজ ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া গাছের অজ্ঞাত রোগ এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহু তালগাছ অকালে মারা যাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে এই গাছ সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।তালগাছ এশিয়া ও আফ্রিকার গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের একটি পরিচিত ফলগাছ। এ গাছের ফলকে তাল বলা হয়। গ্রামাঞ্চলে এটি পানিতাল নামে পরিচিত। তাল এরিকেসি (Arecaceae) পরিবারের বরাসাস (Borassus) গণের উদ্ভিদ। তালের ফল ও বীজ বাঙালির জনপ্রিয় খাদ্য। তালের ফলের ঘন নির্যাস থেকে তালের ফুলুরি তৈরি করা হয়। তালের বীজও লেপা বা তালশাঁস নামে খাওয়া হয়। তালে রয়েছে ভিটামিন এ, বি ও সি, জিংক, পটাশিয়াম, আয়রন ও ক্যালসিয়ামসহ নানা খনিজ উপাদান। এ ছাড়া এতে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান। পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ এ ফলে ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ জলীয় অংশ, ২৯ ক্যালরি শক্তি, ৬ দশমিক ৫ গ্রাম শর্করা, ৪৩ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান রয়েছে।ক্রেতারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার তালের শাঁসের দাম অনেক বেশি। এরপরও মৌসুমি ও সুস্বাদু ফল হওয়ায় এর প্রতি আগ্রহের কমতি নেই। প্রচণ্ড তাপদাহে কাজিপুর উপজেলায় তালের শাঁসের কদর বেড়েছে। মানুষ শরীরের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে তালের শাঁস কিনে খাচ্ছেন। দাম কিছুটা বেশি হলেও সে দিকে তাকাচ্ছেন না ক্লান্ত ও পরিশ্রমী মানুষজন। অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষের কাছেও তালের শাঁসের কদর বেশি।তালের চাহিদা থাকায় বিচি হিসেবেও বিক্রি হচ্ছে। বড় তালের প্রতি বিচি শাঁস ৮ টাকা করে, তিন বিচির তালের শাঁস বিক্রি হচ্ছে ২৪ টাকায়। আবার ছোট তালের বিচির শাঁস ৫ টাকা হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা মূল্যের দিকে না তাকিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে কিনে নিচ্ছেন।পৌরসভার আলমপু্র গোলচত্বরে তালের শাঁস বিক্রেতা আমিনুল ইসলাম বলেন, গ্রাম থেকে তাল কিনে ভ্যানে করে গ্রামগঞ্জে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করি। প্রতি পিস তাল প্রকারভেদে ৪ থেকে ৬ টাকায় কিনতে হয়। বিক্রি করি ১০ থেকে ১৫ টাকায়। গত দুই সপ্তাহ ধরে বিক্রি করছি। এতে দৈনিক ৯০০ থেকে এক হাজার টাকার বিক্রি হচ্ছে। আয় যেমন, কষ্টও তেমন।কাজিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোঃ রাসেল বলেন, তালের শাঁসের অনেক উপকারিতা রয়েছে। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ আছে। তালের শাঁস একটি আঁশযুক্ত খাবার। এ শাঁস খেলে কোলন ক্যান্সারের সম্ভাবনা কম থাকে। তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে না খেলে ডায়রিয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে। 

কাজিপুরে গরমে বাড়ছে কাঁচা তালের শাঁসের কদর