প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
নির্বিকার কেন্দ্র, বাড়ছে ক্যাপাসিটি চার্জ, খেসারত দিচ্ছে জনগণ
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতা এবং ক্রমবর্ধমান ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ বেড়ে চলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকার ও বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর।বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতীতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এসব কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির মেয়াদ ২০৩৩ সাল পর্যন্ত থাকায় উৎপাদনে না থাকলেও তাদের নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে।সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে আগামী অর্থবছরে সরকারের লোকসান প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি থেকে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা আয় হলেও বাকি অর্থ ভর্তুকি হিসেবে সরকারকে বহন করতে হবে।বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা জানান, গত দুই দশকে বিদ্যুৎ খাতে পরিকল্পিত উন্নয়ন না হওয়ায় বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতা ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৩০ হাজার ৯৮১ মেগাওয়াট হলেও সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার থেকে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে অতিরিক্ত কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জ বহন করতে হচ্ছে।জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই করতে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, প্রাথমিক ব্যয় বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের আগস্টে দেশের একমাত্র পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ৮০০ মেগাওয়াট এবং চট্টগ্রামে ইউনাইটেড গ্রুপের ৬০০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও উৎপাদনে আসতে পারে। এসব কেন্দ্রের জন্যও সরকারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হবে।বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুতের ইউনিট মূল্যের একটি বড় অংশ বর্তমানে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে ব্যয় হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড়ে ৫ টাকা ৪৬ পয়সা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে, যেখানে ২০১১ সালে এই ব্যয় ছিল ২ টাকা ৩৫ পয়সা।পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ ব্যয় ৫২ হাজার ৬৮১ কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু কেন্দ্র দীর্ঘ সময় বন্ধ বা সীমিত আকারে পরিচালিত হলেও সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে কয়েকটি কেন্দ্রে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘোড়াশাল, টঙ্গী ও বাঘাবাড়ির কয়েকটি ইউনিটে উৎপাদন ব্যয় বিক্রয় মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি বলে পিডিবির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত না হলেও চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কিছু কেন্দ্র উৎপাদনে না থেকেও প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জ গ্রহণ করছে।বর্তমানে দেশে দৈনিক ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ উৎপাদন করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। অবশিষ্ট বিদ্যুৎ আসে বেসরকারি খাত ও আমদানিনির্ভর উৎস থেকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি খাতের ওপর অতিনির্ভরশীলতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে উৎপাদন ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য আনা প্রয়োজন।বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ পূর্বে বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি নির্ভরতা কমানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। বর্তমানে মোট বিদ্যুতের প্রায় ৬৫ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে কেনা হলেও ভবিষ্যতে এ হার ৩০ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা