প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬
তামান্না জানে না, তার পৃথিবীটা ভেঙে গেছে
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
আমার মা কোথায়? বাবা কি আসছে? খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডে শুয়ে আহত কিশোরী তামান্না খাতুন (১৬) বারবার এমন প্রশ্ন করছে। কিন্তু তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন না পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনরা। কেউ চোখ মুছছেন, কেউ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কারণ, যে বাবা-মায়ের খোঁজ তামান্না করছে, তারা আর কখনো ফিরবেন না।শুক্রবার (৫ জুন) সকালে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার মেঘুল্লা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বাস ও অটোভ্যানের ভয়াবহ সংঘর্ষে তামান্নার বাবা মোতালেব সরকার (৪০) ও মা ফজিলা খাতুন (৩৫) ঘটনাস্থলেই নিহত হন। একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান অটোভ্যানচালক নুরু (৪৫)।অথচ এই নির্মম সত্যটি এখনো জানে না তামান্না।হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা মেয়েটি মাঝে মাঝেই চোখ খুলে মা-বাবার কথা জানতে চাইছে। স্বজনরা তাকে শুধু বলছেন, ওরা অন্য ওয়ার্ডে আছে, চিকিৎসা নিচ্ছে।তামান্নার এক স্বজন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,ও যখন জিজ্ঞেস করে, আমার মা কই, বাবা কই, তখন বুকটা ফেটে যায়। কিন্তু আমরা কীভাবে বলব, ওর মা-বাবা আর এই পৃথিবীতে নেই। ডাক্তারও বলেছেন এখন এমন খবর দিলে ওর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে।স্থানীয়দের ভাষ্য, তামান্না এখনো স্কুলের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। পড়াশোনা করে বড় হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। বাবা-মায়ের একমাত্র ভরসা ছিল এই মেয়েটি। আর মেয়েটির পৃথিবীও ছিল তার বাবা-মাকে ঘিরে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের একটি দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে সেই পৃথিবী।হাসপাতালের একটি বেডে শুয়ে থাকা তামান্না হয়তো এখনো বিশ্বাস করে, চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলে বাবা তাকে হাত ধরে নিয়ে যাবে, মা মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর। তার অপেক্ষার প্রহর আর কখনো শেষ হবে না।বেলকুচির আজুগরা গ্রামের বাড়িতে এখন শুধুই কান্না আর আহাজারি। একদিকে স্বামী-স্ত্রীর নিথর মরদেহ, অন্যদিকে হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তাদের কিশোরী মেয়ে।প্রতিবেশীরা বলছেন, মোতালেব সরকার ছিলেন পরিশ্রমী ও পরিবারপ্রেমী মানুষ। মেয়ের লেখাপড়া নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। ফজিলা খাতুনও সারাক্ষণ মেয়েকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। সেই স্বপ্নগুলো এখন রক্তাক্ত সড়কের ধুলোর সঙ্গে মিশে গেছে।খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, তামান্নার শারীরিক অবস্থা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণে সে শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি গভীর মানসিক ধাক্কাও পেয়েছে। তার শারীরিক অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি মানসিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দুর্ঘটনায় শুধু তিনটি প্রাণ ঝরে যায়নি, ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে একটি কিশোরীর সমস্ত ভবিষ্যৎ। যে বয়সে বই-খাতা আর স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সে তামান্নাকে হয়তো শিখতে হবে বাবা-মা ছাড়া পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কঠিন বাস্তবতা। তামান্না এখনো অপেক্ষা করছে, একটি অসম্ভব ফিরে আসার জন্য।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা