প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬
নিমগাছীতে ঐতিহ্যেবাহী বাঁশের মেলা ও জামাই বরণ উৎসব আজ
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছী বাজারে প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের দ্বিতীয় রবিবার বসে শতবর্ষী ঐতিহ্যের “বাঁশের মেলা” বা “জামাই বরণ মেলা”। প্রায় সাড়ে চারশ বছরের পুরোনো এ লোকজ উৎসব এখন শুধু একটি মেলা নয়, বরং উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও লোকঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়েছে।দুই দিনব্যাপী এ মেলায় অংশ নেয় স্থানীয় মানুষ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্য, দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থী এবং আত্মীয়-স্বজন। বিশেষ করে জামাই আপ্যায়নকে কেন্দ্র করে মেলাটি এলাকায় “জামাই মেলা” নামেও ব্যাপক পরিচিত।বাংলার হাজার বছরের গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ হলো মেলা। সময়ের পরিবর্তনে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও নিমগাছীর বাঁশের মেলা এখনও নিজস্ব স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। স্থানীয়দের মতে, এই মেলার ইতিহাস চার থেকে সাড়ে চারশ বছরের পুরোনো। প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে বাঁশকে ঘিরে নানা সামাজিক ও ধর্মীয় আচার পালিত হয়ে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় বিশেষভাবে সাজানো “মাদার বাঁশ”কে কেন্দ্র করেই শুরু হয় এ উৎসব।প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম রবিবার একটি নির্দিষ্ট বাঁশ চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তী রবিবার সেই বাঁশ কেটে লাল শালুকের কাপড়ে মুড়িয়ে সাজানো হয়। পরে “মাদার বাঁশ” বহনকারী দল ঢাক-ঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। এ সময় লাঠিখেলা, কসরত ও বিভিন্ন লোকজ খেলার প্রদর্শনী করা হয়। পুরো জনপদজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ।স্থানীয়দের মধ্যে এখনও প্রচলিত রয়েছে—মেয়েরা বাপের বাড়ি আসবে, জামাই আসবে শ্বশুরবাড়ি। কোন বাড়ির জামাই কত বড় মাছ নিয়ে আসবে, তা নিয়েও চলে এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা। মাছ নিয়ে আসার পর জামাইকে দেওয়া হয় মেলার “পরবি” বা উপহারস্বরূপ টাকা। পাশাপাশি মেয়ে ও জামাইকে নতুন কাপড় ও ছাতা উপহার দেওয়ার রীতিও এখনও অনেক পরিবারে চালু রয়েছে।স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই মেলার সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ওঁরাও ও মাহাতো সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে বাঁশ ছিল পবিত্রতার প্রতীক। ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার ও সামাজিক রীতিনীতির সমন্বয়ে ধীরে ধীরে এটি বৃহৎ লোকজ উৎসবে রূপ নেয়।মেলায় আগত দর্শনার্থীরা জানান, ধান কাটা ও মাড়াই শেষে এ আয়োজন গ্রামীণ জনপদে বাড়তি আনন্দ নিয়ে আসে। আত্মীয়-স্বজনের আগমন, জামাই আপ্যায়ন এবং লোকসংস্কৃতির মিলনে এটি এখন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী উৎসবে পরিণত হয়েছে।মেলার অন্যতম আকর্ষণ হলো বাঁশের তৈরি নানা সামগ্রী। এখানে পাওয়া যায় ঝুড়ি, চালুনি, ডালা, হাতপাখা, মাছ ধরার ফাঁদসহ গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণ। এছাড়াও মাটির খেলনা, লোকজ অলংকার, কৃষি সরঞ্জাম এবং ঐতিহ্যবাহী দই-মিষ্টির, ঝুড়ি মুড়কি,বড় বড় মাছের দোকানে ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। ফলে পুরো মেলাপ্রাঙ্গণ পরিণত হয় গ্রামীণ জনজীবনের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।একসময় এ মেলায় লাঠিখেলা, পুতুল নাচ,পালাগান, জুমুর গান ও গ্রামীণ নাটক ছিল প্রধান আকর্ষণ। আধুনিক বিনোদনের প্রভাব পড়লেও এখনও লোকজ সংস্কৃতির অনেক উপাদান টিকে আছে। নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ ঐতিহ্য তুলে ধরতে এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা।শুধু সাংস্কৃতিক দিক থেকেই নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও মেলাটির গুরুত্ব অপরিসীম। আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে এসে পসরা সাজান। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কারুশিল্পীরা তাদের পণ্য বিক্রির সুযোগ পান। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয় প্রাণচাঞ্চল্য।বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে মেলাটি সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐক্যেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই মেলা নতুন প্রজন্মকে তাদের শেকড় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করে।নিমগাছীর ঐতিহ্যবাহী বাঁশের মেলা শুধু একটি লোকজ উৎসব নয়; এটি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও লোকঐতিহ্যের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। আধুনিকতার এই যুগেও শতবর্ষী এ আয়োজন আমাদের শেকড়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই এ ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা শুধু স্থানীয় মানুষের নয়, বরং পুরো দেশের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা