প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬
বিরাট রাজার রাজমহল বুরুজ এখন ইতিহাসের স্বাক্ষী
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধামাইনগর ইউনিয়নের ক্ষীরতলা গ্রাম। প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন ছড়িয়ে আছে এ গ্রামজুড়ে। এক সময় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস থাকলেও এখন এ গ্রামের বাসিন্দা সব ধর্মের মানুষই।সরেজমিন ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে বিলীয়মান এ স্থাপনার বিষয়ে জানা যায় নানা বিষয়। স্থানীয়দের কাছে ধ্বংসপ্রায় এ স্থাপনাটি বুরুজ নামে পরিচিত। কারণ হিসেবে তারা বলেন, সমতল থেকে এটি বেশ কিছু উঁচু। এক সময় এর উচ্চতা আরো বেশি ছিল। ছিল বিশেষ ধরনের ইটের তৈরি স্থাপনা। দেখে কোনো এক পোড়াবাড়ি বলে মনে হতো। এখনো চারদিকে এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খ ম রেজাউল করিম লিখিত রায়গঞ্জ ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি গ্রন্থে এ স্থাপনাকে মহাভারতের বিরাট রাজার রাজমহল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, নিমগাছী হাটের উত্তর দিক দিয়ে প্রসারিত উত্তর- দক্ষিণে চলে যাওয়া পুরাতন সড়কের চিহ্ন ধরে মাইল দেড়েক উত্তর দিকে গেলে সড়কের পশ্চিম পাশে পরপর কয়েকটি ঢিবির দেখা মেলে। ঢিবিগুলোর শেষ প্রান্তে সড়কের পূর্ব দিকে দেখা যায় অপেক্ষাকৃত বিরাট আকৃতির এক ঢিবি। এটি প্রায় দুই একর স্থানজুড়ে বিস্তৃত। এটির উচ্চতা প্রায় ৭.৬০ মিটার বা ২৫ ফুট। এর চারপাশে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে বেশ কয়েকটি ছোট- বড় ঢিবি দেখা যায়। এখানে ভবন, মন্দির, দুর্গ, বুরুজ ও বিভিন্ন স্থাপনার অস্তিত্ব বুঝতে পারা যায়। বিশাল ঢিবিটাকে মহাভারতে বর্ণিত বিরাট রাজার রাজপ্রাসাদ বলে অভিহিত করা হয়। স্থানীয়ভাবে এটি রাজবাড়ি বা বিরাট রাজার বাড়ি বলে পরিচিত। অনেকে বুরুজ বলেও পরিচয় করিয়ে দেন। এখান থেকে প্রাপ্ত দেয়াল, পাথর ও ইটের টুকরো, ধ্বংসাবশেষ, ভগ্নপাত্রের খন্ড ইত্যাদি থেকে ও পারিপার্শ্বিক অবস্থাদৃষ্টে ধারণা করা হয়, গুপ্ত যুগের বা তার পরবর্তী পাল যুগের প্রথম দিকে প্রাচীন করোতোয়া নদীর তীরে নিমগাছী এলাকায় একটি সমৃদ্ধ জনপদ গড়ে উঠেছিল। যার বিস্তার এ অংশ পর্যন্ত ছিল। ক্ষীরতলা এলাকার প্রত্নস্থলকে বিরাট রাজার গোগৃহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঢিবিতে গুপ্তধনের আশায় স্থানীয় লোকজন খোঁড়াখুঁড়ি করার ফলে এসব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানকার ইট তুলে নিয়ে অনেকেই ব্যক্তিগত কাজে লাগিয়েছেন বলে জানান অনেকে। ২০১৮ সাল থেকে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মো. রিফাত-উর-রহমানের তত্ত্বাবধানে ক্ষীরতলা গ্রামে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান পরিচালিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১৫টি প্রত্নস্থল শনাক্ত করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এসবের মধ্যে বিরাট রাজার ঢিবি, আমির আলীর ঢিবি, অর্জুন গড়, কাতলা পুকুর, শ্যামল দীঘি, পাহাড় প্রতাপ অন্যতম। পদ্ধতিগত দিক থেকে প্রতিটি প্রত্নস্থলের পরিমাপ, নমুনা সংগ্রহ করে তারা গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন। নমুনাসমূহের মধ্যে প্রচুর মৃৎপাত্রের টুকরা, প্রাচীন ইট এবং তিনটি পোড়ামাটির ফলক উল্লেখযোগ্য। পোড়ামাটির ফলক তিনটির মধ্যে একটি ধ্যানী বুদ্ধের ভূমিস্পর্শমুদ্রা সম্বলিত, একটি বানরের মুখচ্ছবি সম্বলিত এবং বাকি একটি সর্পের ফনা সম্বলিত। ক্ষীরতলার প্রত্নস্থান অনুসন্ধান সম্পর্কে প্রত্নতাত্ত্বিক মো. রিফাত- উর রহমান বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক কর্মকান্ড অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ একটি বিষয়। খুব সহজেই একটি প্রত্নস্থলের সময়কাল নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে, গত ছয় বছরব্যাপী পরিচালিত সমীক্ষা থেকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য আমরা সংগ্রহ করতে পেরেছি। একইসাথে মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুরের প্রত্নবস্তুর সাথে ক্ষীরতলার প্রত্নবস্তুগুলোর তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে। মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত ইটের সাথে ক্ষীরতলায় প্রাপ্ত প্রাচীন ইটের সাদৃশ্যতা লক্ষ্যণীয়। এছাড়া বুদ্ধের ভূমিস্পর্শমুদ্রা সম্বলিত পোড়ামাটির ফলকের মতো হুবহু ফলক পাহাড়পুরে পাওয়া গেছে। এগুলো থেকে আমরা আপাতত ধারণা করছি ক্ষীরতলার প্রত্নস্থলগুলো হয়তো পাল শাসনামলে গড়ে উঠেছিল। তবে, এখনও যেহেতু উৎখনন করা হয়নি, তাই আমরা প্রত্নবস্তুগুলোর রেডিওকার্বণ পরীক্ষা করতে পারিনি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর আমাদেরকে অনুমতি দিলে আমরা ক্ষীরতলার প্রত্নস্থলগুলো উৎখনন করে নমুনা সংগ্রহপূর্বক সেগুলোর রেডিওকার্বণ পরীক্ষা করতে আগ্রহী। এছাড়াও প্রতিটি প্রত্নস্থলের অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ সংগ্রহ করে জিআইএস এবং রিমোট সেন্সিং মানচিত্রায়ণের মাধ্যমে এই গ্রামের ভূপরিবৈশিক প্রেক্ষিত সম্পর্কে ধারণা নেয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন বলে জানান তিনি। স্থানীয়ভাবে পরিচিত বিরাট রাজার ঢিবি থেকে আনুমানিক ৪৫০ মিটার পূর্বে একটি নদীর মরাখাত পাওয়া গেছে। এটি মরা করতোয়া হিসেবে পরিচিত। অতীতে কি নৌপথে মহাস্থানগড়ের সাথে ক্ষীরতলার যোগাযোগ ছিল- এমন প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন। আমরা এখনও নিশ্চিত নই। এসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদেরকে আরও দীর্ঘ সময় ক্ষীরতলার প্রত্নস্থলগুলো নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করতে হবে। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ইতোমধ্যে বিরাট রাজার ঢিবিকে সংরক্ষিত প্রত্নস্থল হিসেবে তালিকাভুক্ত করলেও অন্যান্য প্রত্নস্থানগুলো অনেকটাই ঝুঁকির সম্মুখীন। এক্ষেত্রে প্রত্নস্থলগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি বলে জানান তিনি। মাহাতোদের কুড়মালি ভাষার লেখক ও গবেষক উজ্জ্বল কুমার মাহাতো বলেন, বুরুজকে কেন্দ্র করে স্থানীয় নৃ- গোষ্ঠীর মানুষ নানা ধরনের খেলা ও উৎসব আয়োজন করে থাকে। নিমগাছী ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও স্থানীয় নৃ- গোষ্ঠীর মানুষ যোগেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, এ বুরুজের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখনো যতটুকু আছে তার সংরক্ষণ করা জরুরি। এখানে খনন করে ঐতিহ্য ইতিহাস আবিষ্কার করার দাবি জানান তিনি। প্রত্নতাত্ত্বিক এ নিদর্শন দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসেন এখানে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা