প্রিন্ট এর তারিখ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দেশের সীমান্ত, বন্দর ও সামুদ্রিক এলাকা দিয়ে নানা কৌশলে দেশে ঢুকছে মাদক। আকাশপথ ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও আসছে নিত্যনতুন মাদক। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) দেশের ১৮টি সীমান্ত জেলার ১০৫টি পয়েন্টকে মাদকের প্রবেশের সেফ রুট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব পয়েন্ট দিয়ে ২৭ ধরনের মাদক দেশে প্রবেশ করছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।ফলে শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দেশের প্রায় সব এলাকাতেই মাদকের বিস্তার ঘটেছে।তিন প্রধান করিডর দিয়ে প্রবেশমাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট বাংলাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী, প্রধানত তিনটি করিডর দিয়ে ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক দেশে প্রবেশ করছে। এগুলো হলো ভারতের সীমান্তবর্তী পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চল এবং মিয়ানমার সীমান্তবর্তী দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল।ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার।এ ছাড়া আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকেও উচ্চমূল্যের মাদক দেশে আসছে।আন্তর্জাতিক চোরাচালানের রুটে বাংলাদেশআন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের রুট গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ভৌগোলিক অবস্থান এবং অরক্ষিত সীমান্তের সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রগুলো বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে।বাংলাদেশ পশ্চিম ও উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরে আসাম, উত্তর ও উত্তর-পূর্বে মেঘালয় এবং পূর্বে ত্রিপুরা ও মিজোরাম দ্বারা বেষ্টিত। দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমানা রয়েছে।ভারত থেকে গাঁজা ও ফেনসিডিল এবং মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ও আইস দেশে প্রবেশ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।ঢাকা ও আশপাশে আসে ১৭ শতাংশদেশে প্রবেশ করা মোট মাদকের ১৭ শতাংশ ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় আসে। বাকি ৮৩ শতাংশ মাদক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।অল্প সময়ে ধনী হওয়ার প্রবণতা থেকে দেশের অসৎ লোকজন মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। এ ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষক, ব্যবসায়ী, বাহক ও বিক্রির নেটওয়ার্কে প্রতিবছরই লোকসংখ্যা বাড়ছে।চিহ্নিত ১০৫ প্রবেশপথমাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর দেশের সীমান্তসংলগ্ন ১৮টি জেলার ১০৫টি পয়েন্টকে মাদকের প্রবেশপথ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পশ্চিমাঞ্চল সীমান্তের পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে সাতক্ষীরার কলারোয়া, দেবহাটা, ভোমরা, কাকডাঙ্গী ও পলাশপুর; যশোরের বেনাপোল, পুটখালী, চৌগাছা, নারায়ণপুর, শার্শা ও আশপাশের এলাকা; চুয়াডাঙ্গার কারপাশডাঙ্গা, দর্শনা ও জীবননগর; মেহেরপুরের দারিয়াপুর ও বুড়িপটা।রাজশাহীর মনিগ্রাম, চারঘাট, সারদা, ইউছুফপুর, কাজলা, বেলপুকুরিয়া, হরিপুর, গোদাগাড়ি, বাঘা ও রাজশাহী সদর; চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট, শাহবাজপুর, বিনোদপুর, সোনামসজিদ স্থলবন্দর ও কানসাট; জয়পুরহাটের পাঁচবিবি; দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট, ফুলবাড়ী, বিরামপুর, হিলি, হাকিমপুর, কামালপুর, বিরল, আকাশকারপুর, খানপুর, দাইনুর, মালিগ্রাম ও বনতারা; সিলেটের জকিগঞ্জ, চুনারুঘাট ও মাধবপুর; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার করিমপুর, কসবা, আখাউড়া, সিংগারবিল, পাহাড়পুর ও বিজয়নগর; কুমিল্লার জগন্নাথ দিঘি, চৌদ্দগ্রাম, গোলাপশাহ, কালিকাপুর, জগন্নাথপুর, রাজাপুর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও বিবিরবাজার এবং ফেনীর ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম রয়েছে এই তালিকায়।উত্তরাঞ্চল সীমান্তের কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী, রৌমারী, ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী, বাশজানি, বলারহাট, বলাবাড়ি, কুটি চন্দ্রকোনা, পাথরডুবি ও নাখারগঞ্জ; লালমনিরহাটের লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, পাটগ্রাম ও বুড়িমারী; শেরপুরের ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী; ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া এবং নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দাও তালিকায় রয়েছে।দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল সীমান্তের কক্সবাজার জেলার জালিয়াপাড়া, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, শাহপরীর দ্বীপ, টেকনাফ, সাবরাং, সাউথপাড়া, ধুমধুমিয়া, জদিপাড়া, সাউথ হ্নীলা, লেদাপাড়া, চৌধুরীপাড়া, নোয়াপাড়া, হোয়াইক্যং, তুমরু উখিয়া, কাটাখালী, বালিখালী, ঘুমধুম ও কাটাপাহাড়কেও মাদকের প্রবেশপথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।১৮ বছরে বিপুল মাদক জব্দমাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও কোস্টগার্ডসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উদ্ধার করা মাদক, আসামি ও মামলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৬ সাল এবং চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৪৪ কোটি ৯৯ লাখ ২৬ হাজার ৯০৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে।এ সময়ে ৪ হাজার ৭৮৯ কেজি হেরোইন, ২২৭ কেজি কোকেন, ৩৭৮ কেজি আফিম, ১১ লাখ ১৫ হাজার ৮০৮ কেজি গাঁজা, ১ কোটি ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ১৫৩ বোতল ফেনসিডিল, ২২ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮৬টি অ্যাম্পুল ইনজেকটিং ড্রাগ এবং ৩৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৫২ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে।একই সময়ে ১২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৮টি মামলায় ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৬৫১ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।প্রবেশ ঠেকাতে পুলিশের তৎপরতাবাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, সীমান্তের কোন কোন পথে মাদক আসছে তা চিহ্নিত করা হয়েছে। মাদকের প্রবেশ ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশ তৎপর রয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশও কাজ করছে।তিনি বলেন, নিয়মিত চেকপোস্ট ও অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মাদক উদ্ধার এবং আসামি গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক আনা হচ্ছে। অনেক সময় লোভ-লালসায় পড়ে এজেন্সির লোকজনও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। কোনো বাহিনীর সদস্য এসব কাজে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলে তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। মাদক প্রবেশ ঠেকাতে পুলিশের তৎপরতা আরও বাড়ানো হয়েছে।গডফাদার ও পৃষ্ঠপোষকদের তালিকামাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, মাদকের বিস্তার ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদকের গডফাদার, পৃষ্ঠপোষক ও বিভিন্ন স্তরের কারবারিদের তালিকা তৈরি করে সে অনুযায়ী অভিযান চালানো হচ্ছে। তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়।তিনি বলেন, অভিযানে মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার হচ্ছে এবং মাদকও উদ্ধার করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রায়ই যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। মাদকের অবৈধ ব্যবহার, কেনাবেচা ও অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে দমন এবং বিচার নিশ্চিত করতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।