প্রিন্ট এর তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬
জরাজীর্ণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জনবল ও ওষুধ সংকট
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ভাঙা দরজা-জানালা। ভবনের ছাদে জন্মেছে বটগাছ, যার শিকড় ঢুকে গেছে ঘরের ভেতরে। বৃষ্টি হলেই দেয়াল ও মেঝে পানিতে ভেসে যায়। চারপাশ ঘিরে ধরেছে পরগাছা ও জঙ্গল। এমন নড়বড়ে পরিস্থিতির মধ্যেই চলছে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার ইয়াকুবপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের কার্যক্রম।কেন্দ্রটিতে পাঁচজনের জনবল থাকার কথা থাকলেও মাত্র একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার দিয়ে সেবা কার্যক্রম চলছে। সপ্তাহের চার দিন তিনি এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা দেন এবং অন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আরও দুই দিন দায়িত্ব পালন করেন। এভাবেই খুঁড়িয়ে চলছে ফেনীর আটটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র।শুধু ফেনী নয়, দেশের অধিকাংশ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রেও জনবল, ওষুধ ও অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠান নিজেরাই এখন সংকটে পড়েছে।প্রান্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তীব্র জনবল সংকটস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রান্তিক মানুষকে সেবা দিতে প্রায় ১ হাজার ১০০ ইউনিয়ন সাব-সেন্টার রয়েছে। এসব কেন্দ্রে একজন মেডিকেল অফিসার, একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন ফার্মাসিস্ট এবং একজন অফিস সহায়কের পদ রয়েছে। তবে কাগজে চারটি পদ থাকলেও অধিকাংশ জায়গায় অর্ধেক জনবল দিয়ে সেবা কার্যক্রম চলছে।পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৃণমূল পর্যায়ের সেবায় অধিদপ্তরের আওতায় রয়েছে ৩ হাজার ২৯০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন এমএলএসএস কাম নিরাপত্তাপ্রহরী এবং একজন আয়ার পদ রয়েছে। মোট পাঁচটি পদ থাকলেও জনবল সংকটের কারণে অধিকাংশ কেন্দ্রে অর্ধেক বা তারও কম জনবল দিয়ে সেবা চলছে।কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্ট সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে ১৪ হাজার ৪৬৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। এসব ক্লিনিকেও ওষুধের সংকট রয়েছে।চিকিৎসক পদও শূন্যস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতাল ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৪১ হাজার ৮০৬টি। এর মধ্যে ৯ হাজার ৪০৭টি পদ শূন্য। অর্থাৎ অনুমোদিত চিকিৎসক পদের প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশই বর্তমানে শূন্য রয়েছে।জানা গেছে, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিক প্রসব, গর্ভবতী মায়ের নিয়মিত পরীক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা এবং নবজাতকের সেবা দেওয়ার কথা। কিন্তু অনেক কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে এসব সেবা নিয়মিত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, অনেক ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে সপ্তাহে মাত্র এক থেকে দুই দিন স্বাস্থ্যকর্মী উপস্থিত থাকেন। কিছু কেন্দ্রে ভবন থাকলেও নিয়মিত চিকিৎসাসেবা নেই। কোথাও বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি কিংবা ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যাও রয়েছে। অনেক ভবন সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।ফলে সাধারণ মানুষ সামান্য জ্বর, ডায়রিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা গর্ভকালীন সেবার জন্যও উপজেলা সদরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তাঁদের সময়, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার সংকট রাজধানীসহ জেলা হাসপাতালগুলোর ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারের পরিকল্পনাফেনীর পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার করে দোতলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ওষুধের সংকটও রয়েছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে ওষুধ সরবরাহের আশ্বাস পাওয়া গেছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ইউনিয়ন সাব-সেন্টারগুলোতে চিকিৎসক, অন্যান্য কর্মী এবং ওষুধের সংকট রয়েছে। সরকার এবার স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় বাজেট দিয়েছে। এ ছাড়া এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।তিনি জানান, প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে স্বাস্থ্যকর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবেন। জরাজীর্ণ ভবনের জায়গায় নতুন অবকাঠামো নির্মাণের কাজও পরিকল্পনায় রয়েছে। ফলে দ্রুত এসব সংকটের অনেকটাই দৃশ্যমানভাবে সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।এক ছাতার নিচে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পরামর্শঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ইউনিয়ন সাব-সেন্টার, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং কমিউনিটি ক্লিনিক কাজ করছে। প্রতিটি ব্যবস্থাতেই জনবল সংকট রয়েছে। এগুলোর তত্ত্বাবধান করে আলাদা প্রতিষ্ঠান। তিন ধারাকে এক ছাতার নিচে এনে সমন্বিতভাবে সেবা দেওয়া গেলে জনবল সংকটের সমাধান হবে।তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ সেবা বিস্তৃত করে বাড়ি বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। তবে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র চালু রেখেই এ কার্যক্রম করতে হবে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি উপজেলা হাসপাতালে সেবার পরিধি বাড়াতে হবে। রেফারেল পদ্ধতি গড়ে উঠলে জেলা, বিভাগ এবং ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কমবে।প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা সরকারেরস্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যেসব ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে, সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে।তিনি জানান, সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে। তাঁদের ৮০ শতাংশ হবেন নারী স্বাস্থ্যকর্মী। তাঁরা নির্দিষ্ট এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস পরিমাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা দেবেন। একটি মূল ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকবে এবং সেখান থেকে ওয়ার্ডগুলোতে সেবা পরিচালনা করা হবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা