প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুলাই ২০২৬
অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেই
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় বাস্তবে কার্যকর না হওয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, ভিসা-বাণিজ্য, অসাধু জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সিন্ডিকেট এবং মন্ত্রণালয়ের তদারকির অভাবে নির্ধারিত ব্যয়ের পরিবর্তে পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি অর্থ নিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। এতে নিরাপদ ও স্বল্প ব্যয়ের অভিবাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।১০ বছরের পুরোনো ব্যয় কাঠামোতথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালে সৌদি আরব এবং ২০১৭ সালে মালয়েশিয়া, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১৪টি দেশের জন্য অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করে নোটিস জারি করে। ওই নোটিসে পুরুষ কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সার্ভিস চার্জ, বিমান ভাড়া, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ভিসা ফি ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে দেশভেদে সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয়।নোটিস অনুযায়ী, সৌদি আরবের জন্য এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা, মালয়েশিয়ায় কৃষি শ্রমিকের জন্য এক লাখ ৪০ হাজার, লিবিয়ার জন্য এক লাখ ৪৫ হাজার, বাহরাইনের জন্য ৯৮ হাজার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য এক লাখ সাত হাজার, কুয়েতের জন্য এক লাখ সাত হাজার, ওমানের জন্য এক লাখ, ইরাকের জন্য এক লাখ ২৯ হাজার, কাতারের জন্য এক লাখ, জর্ডানের জন্য এক লাখ দুই হাজার ৭৮০, মিসরের জন্য এক লাখ ২০ হাজার, রাশিয়ার জন্য এক লাখ ৬৬ হাজার, মালদ্বীপের জন্য এক লাখ ১৫ হাজার, ব্রুনাইয়ের জন্য এক লাখ ২০ হাজার এবং লেবাননের জন্য এক লাখ ১৭ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি ব্যয় কাঠামো বাস্তবায়ন না হওয়ায় ভিসা-বাণিজ্য, অগ্রহণযোগ্য ব্যয় নির্ধারণ, দেশি-বিদেশি মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এবং মন্ত্রণালয়ের দুর্বল তদারকি অভিবাসন ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মীদের দক্ষতার ওপরও ব্যয়ের পরিমাণ নির্ভর করে।অতিরিক্ত ব্যয়ে বিপাকে প্রবাসীরাপ্রবাসীদের ভাষ্য, বিদেশে যেতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তা তুলতেই কয়েক বছর লেগে যায়। অনেকেই ঋণ করে বিদেশে গেলেও সেই ঋণ শোধের আগেই অবৈধ হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন। এতে জীবনমানের উন্নতির পরিবর্তে অভিবাসন ব্যয়ের বোঝাই বড় হয়ে দাঁড়ায়।সুনামগঞ্জের বাসিন্দা রিসান আহমদ ২০২৪ সালের শেষ দিকে কাতারে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে যান। তিনি জানান, একটি ভিসা কিনতে সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তার মোট ব্যয় দাঁড়ায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা। এই অর্থ জোগাতে তাকে কৃষিজমি বিক্রি ও ঋণ নিতে হয়েছে। বিদেশে যাওয়ার দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো মোট ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি অর্থ তুলতে পারেননি। তার মতে, সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।সৌদিপ্রবাসী রবিউল আলম বলেন, ২০২০ সালে প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয় করে তিনি সৌদি আরবে যান। সেখানে গিয়ে কাজ না পাওয়ায় দীর্ঘদিন পরিবারে অর্থ পাঠাতে পারেননি। পরে ইকামা নবায়নে তিন লাখ টাকা প্রয়োজন হলেও তা পরিশোধ করতে না পেরে বর্তমানে তিনি অবৈধভাবে কাজ করছেন। তার দাবি, সৌদি আরবে তার মতো কয়েক লাখ বাংলাদেশি একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন।গবেষণায় ব্যয় বৃদ্ধির চিত্রআন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত গত বছরের কস্ট অব মাইগ্রেশন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে একজন শ্রমিকের গড় অভিবাসন ব্যয় ২০২২ সালে ছিল তিন লাখ ৮৬ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে চার লাখ ১৭ হাজার এবং ২০২৪ সালে চার লাখ ৬৩ হাজার টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ দুই বছরে অভিবাসন ব্যয় ২১ শতাংশ বেড়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় প্রকৃত ব্যয় প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকার কাছাকাছি স্থির রয়েছে।গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, একজন বাংলাদেশি শ্রমিককে বিদেশে যাওয়ার ব্যয় তুলতে গড়ে ১০ দশমিক ২ মাসের আয় ব্যয় করতে হয়। ফিলিপাইনের পুরুষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এ সময় ১ দশমিক ১ মাস এবং নারীদের ১ দশমিক ৪ মাস। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় পুরুষদের ৭ দশমিক ২ মাস এবং নারীদের ৭ দশমিক ৬ মাস, মালদ্বীপে পুরুষদের ৮ দশমিক ৩ মাস ও নারীদের ৩ দশমিক ৯ মাস, ঘানায় পুরুষদের দুই মাস ও নারীদের ২ দশমিক ১ মাস, লাওসে পুরুষদের ৩ দশমিক ২ মাস এবং নারীদের ৩ দশমিক ৩ মাস লাগে। বাংলাদেশে নারীদের ক্ষেত্রে এই সময় ৯ দশমিক ৪ মাস।বাস্তবসম্মত ব্যয় নির্ধারণের দাবিবাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের হার বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তিসংগত নয়। এটি ১০ বছর আগের ব্যয় কাঠামো। তাই বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত অভিবাসন ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।তিনি বলেন, নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি না হওয়ায় কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বিদেশি কোম্পানির চাহিদা আনতে এবং কর্মী সংগ্রহে বিভিন্ন স্তরের মধ্যস্বত্বভোগীদের অর্থ দিতে হয়। এসব কারণও অভিবাসন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে এবং প্রতি বছর তা পর্যালোচনা করতে হবে। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সব ধরনের অর্থ লেনদেনে রসিদ বাধ্যতামূলক করা এবং এজেন্টদের সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ করে দিলে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ কমবে।মন্ত্রণালয়ের অবস্থানপ্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব সাইফুল হক চৌধুরী বলেন, অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং রিক্রুটিং এজেন্সি ও বিদেশগামী কর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যয় কাঠামো নির্ধারণে মন্ত্রণালয় কাজ করছে।তিনি বলেন, কোন দেশের জন্য কত টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হবে, সে বিষয়ে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা