প্রিন্ট এর তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬
তালিকা বদল, কমিটি বদল; কমবে কি ওষুধের দাম?
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
নিয়মিত দুই বেলা খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে অসুস্থ হলে ওষুধ কেনা অনেক নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য আরও বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায়। রোগব্যাধি অর্থনৈতিক অবস্থার হিসাব করে আসে না। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা মিললেও অনেক সময় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্র অচল থাকে, বিনামূল্যের ওষুধ মজুত থাকে না। ফলে রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ, এমনকি ব্যান্ডেজ ও গজ পর্যন্ত কিনতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দফায় দফায় ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি, যা চিকিৎসা ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলছে।স্বাস্থ্য খাতের এসব অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও ওষুধের বাজার তদারকির জন্য সরকারের নীতিনির্ধারণী সংস্থা হলো জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় এক দশক এই পরিষদ কার্যকর ছিল না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার পরিষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিলেও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তা সম্পন্ন করতে পারেনি। যদিও তারা বিনামূল্যে বিতরণ বা স্বল্পমূল্যে সরবরাহের জন্য ১১৭টি অতি জরুরি ওষুধের একটি তালিকা প্রণয়ন করেছিল।গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ টাকা স্বাস্থ্য ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ৪৪ টাকাই ব্যয় হয় ওষুধ কেনায়। আর উচ্চমূল্যের চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে ৬১ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যের মুখে পড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনকে সভাপতি করে নতুন জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছে সরকার। সরকারের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা বাড়বে এবং চিকিৎসা ব্যয় কমবে।তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, শুধু নতুন তালিকা ও নতুন কমিটি গঠন করলেই কি ওষুধের দাম কমবে? স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। ২০১৬ সালে জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদের পরও বাজারে ওষুধের দাম কমেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। তাই কার্যকর বাজার তদারকি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কেবল কমিটি বা তালিকা পরিবর্তনে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমবে না।অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত তালিকা বাস্তবায়নের পরিবর্তে চলতি বছরের ২২ জুন বর্তমান সরকার ২২ সদস্যের জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করে। পরে গেজেট সংশোধন করে সদস্যসংখ্যা ২৪-এ উন্নীত করা হয়। নতুন সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিরা।স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ওষুধনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, ওষুধ শিল্পের উন্নয়ন এবং দেশের চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে পরামর্শ দেবে এ পরিষদ।সবশেষ জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা হয় ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি। এতে তালিকাভুক্ত ওষুধের সংখ্যা ১১৭ থেকে বাড়িয়ে ২৯৫ করা হয়। এর আগে ২০১৬ সালের সংশোধিত তালিকায় হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হাঁপানি, সংক্রমণ, ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। নতুন তালিকার লক্ষ্য দেশের মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজলভ্য করা। পাশাপাশি ওষুধের মূল্য, প্রাপ্যতা ও নীতিগত বিষয়গুলোও নতুন পরিষদ পর্যালোচনা করবে।তবে নতুন পরিষদে ওষুধ শিল্পের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আগের কাঠামোয় স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়াতে ওষুধ শিল্পের প্রতিনিধি রাখা হয়নি। কিন্তু এবার বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) একজন প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নীতিনির্ধারণে শিল্প খাতের প্রভাব বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চিকিৎসা ব্যয় কমাতে কয়েকটি কর ও শুল্ক ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের ফলে প্রতিবার ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমতে পারে বলে সরকারের দাবি। পাশাপাশি ক্যানসারের ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালসহ বিভিন্ন ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতেও কর রেয়াত অব্যাহত রয়েছে।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ অবশ্যই একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এর সুফল পেতে হলে সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং বাজারে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় নতুন তালিকার সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।স্বাস্থ্য সচিব ও জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, আগের তালিকাসহ সব বিষয় পর্যালোচনা করে একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর কাঠামো প্রণয়ন করা হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রেসক্রিপশনের ব্যয় কমানোর বিষয়েও সরকার কাজ করছে।জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের সাবেক সদস্য ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদের মতে, সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ নিশ্চিত করতে শুধু কমিটি গঠন যথেষ্ট নয়; সরকারের কার্যকর মূল্য নিয়ন্ত্রণও জরুরি। উৎপাদনকারীরা দফায় দফায় দাম বাড়িয়েও আর্থিক ক্ষতির দাবি করছেন। সেই দাবির বাস্তবতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। উৎপাদন ব্যয়, বাজার কাঠামো ও মুনাফার যৌক্তিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করা গেলে একদিকে যেমন ওষুধ শিল্প টেকসই থাকবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষও প্রয়োজনীয় ওষুধ সাশ্রয়ী দামে কিনতে পারবেন।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা