প্রিন্ট এর তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬
যমুনার ভাঙনে নিঃস্ব চরের শত শত পরিবার
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ও গালা ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামে যমুনা নদীর তীব্র ভাঙনে শত শত পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। চলতি বছরের শুরু থেকে শুরু হওয়া ভাঙনে ফসলি জমি, বসতভিটা, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পুরো এলাকা নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর, ধীতপুর, কুরসি ও বারপাখিয়া এবং গালা ইউনিয়নের মোহনপুর ও বৃ-হাতকোড়া গ্রাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক মাস আগেও যেখানে বসতঘর ছিল, সেখানে এখন প্রবাহিত হচ্ছে যমুনার পানি। অবশিষ্ট বসতভিটা ও ফসলি জমিও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।এলাকাবাসী জানান, এসব চরে পটল, বেগুন, ধান, বাদাম, মাষকলাই, সরিষা, ইরি-বোরো ধান, তরমুজ, বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ধনিয়াসহ নানা ফসলের চাষ হতো। পাশাপাশি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন করে অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরের ধারাবাহিক ভাঙনে তাদের জীবন-জীবিকা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।ধীতপুর গ্রামের শতবর্ষী রহিতন বেগম বলেন, জীবনের শুরু থেকে কষ্ট করে এসেছেন। এখন বয়সের শেষ প্রান্তে এসে যমুনার ভাঙনে বাড়িঘর হারিয়ে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। স্বামীহারা মেয়েকে নিয়ে একটি জরাজীর্ণ ছাপড়াঘরে বসবাস করছেন। জমির আইল থেকে শাক তুলে এবং নদী থেকে মাছ ধরে বিক্রি করে কোনোমতে সংসার চলছে। তিনি জানান, তার বয়স ১২০ বছরের বেশি হলেও এখনো কোনো ভাতার কার্ড পাননি। একমাত্র আশ্রয়স্থলটিও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।ধীতপুর মসজিদের ইমাম আব্দুল আলীম বলেন, একসময় এলাকার মানুষ কৃষিকাজ করে স্বচ্ছল জীবনযাপন করতেন। এখন অধিকাংশ পরিবারের ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।স্থানীয় বাসিন্দা শামছুল হক জানান, এ পর্যন্ত সাতবার তার বসতভিটা ও ফসলি জমি যমুনায় বিলীন হয়েছে। এবারও ভাঙনের মুখে পড়েছেন তিনি। নুরুল ইসলাম বলেন, একসময় সোনাতনীর উর্বর বালুমাটিতে উৎপাদিত ফসলেই সংসার চলত। এখন সবকিছু হারিয়ে তারা দিশেহারা।রফিকুল ইসলাম জানান, গত তিন থেকে চার মাসে শ্রীপুর থেকে বারপাখিয়া পর্যন্ত প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০টি বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে গেছে। তিনি দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।শাহজাহান আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে তিনি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।কুরসি গ্রামের ইয়াসিন মোল্লা জানান, তার পরিবারের প্রায় ৬০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে তার নিজের প্রায় ছয় বিঘা জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও শস্যের আবাদ হতো। এখন শুধু একটি বসতঘর অবশিষ্ট রয়েছে, সেটিও ভাঙনের ঝুঁকিতে।ধীতপুর ঘোনাপাড়া গ্রামের হাফেজ উদ্দিন বলেন, ভাঙনের কারণে কুরসি-ধীতপুর গরুর হাট, মসজিদ, মাদ্রাসা, বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো ইউনিয়নই হুমকির মুখে পড়বে।স্থানীয় বাসিন্দা জিন্নাহ মণ্ডল অভিযোগ করেন, নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা ভাঙনরোধের আশ্বাস দিলেও পরে তা বাস্তবায়ন করেন না। চলতি মৌসুমেই জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।শাহজাদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গত বছর দুই ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামের অন্তত ২৫০ হেক্টর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিপরীতে প্রায় ৯০ হেক্টরের বেশি নতুন চর জেগে উঠেছে। ফলে মোট জমির পরিমাণ খুব বেশি কমেনি। তবে যাদের জমি ভেঙে যাচ্ছে, তারা তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তাই ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা সারমিন এবং সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম এ বিষয়ে ভিডিও বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, চর রক্ষায় তাদের কোনো প্রকল্প নেই। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই এলাকায় ভাঙনরোধে তাদের পক্ষে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা