প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬
রৌমারী সীমান্তের শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে ১২ দিন ধরে ৩ যুবকের মানবেতর জীবন
সুখ বাদশা, রৌমারী(কুড়িগ্রাম) ||
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ভুন্দুরচর সীমান্তের শূন্যরেখায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক পুশইনের শিকার তিন যুবক ১২ দিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও মানবাধিকার প্রশ্নে ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।স্থানীয় সূত্র ও সীমান্ত এলাকাবাসীর দাবি, গত ১৪ জুন গভীর রাতে ভারতের মানকারচর-সোনারপাড়া সীমান্ত এলাকার ১০৬৬ নম্বর সীমান্ত পিলারের পাশ দিয়ে কাঁটাতারের গেট খুলে তিন যুবককে বাংলাদেশের ভুন্দুরচর সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এরপর থেকে তারা দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নজরদারির মধ্যে নোম্যান্সল্যান্ডে অবস্থান করছেন।বুধবার (২৫ জুন) সরেজমিনে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি, ঝড় ও প্রখর রোদের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ওই তিন যুবক। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্যানিটেশন সুবিধার অনুপস্থিতি এবং বিভিন্ন কীটপতঙ্গের উপদ্রবে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।বর্তমানে ভুন্দুরচর সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থানরত তিন যুবক হলেন সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার কাউকান্দি গ্রামের জহিরুল ইসলাম (২৬), নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার সাওতা গ্রামের পারভেজ (২১) এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার কাউছিয়া গ্রামের নাঈম মিয়া (২২)।জানা গেছে, ওই তিন যুবক গত ১০ জুন সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত দিয়ে দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেন। পরে ভারতের আসাম রাজ্যের গৌহাটিতে ট্রেনে ভ্রমণকালে ভারতীয় পুলিশের হাতে আটক হন। পরবর্তীতে তাদের বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হলে গত ১৪ জুন ভোরে রৌমারী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। বর্তমানে তারা আন্তর্জাতিক মেইন পিলার ১০৬৬/৭-এস সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছেন।এর আগে গত ১৪ জুন ভোরে গয়টাপাড়া ও ইজলামারী সীমান্ত দিয়ে মোট নয় বাংলাদেশি নাগরিককে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। এর মধ্যে গয়টাপাড়া সীমান্তে এক নারী, তিন পুরুষ ও দুই শিশুসহ ছয়জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হলে স্থানীয়দের বাধা এবং বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে তারা শূন্যরেখায় অবস্থান নিতে বাধ্য হন।পরবর্তীতে মানবিক বিবেচনায় একই পরিবারের চার সদস্য বিল্লাল হোসেন, তার স্ত্রী সুমি আক্তার, পাঁচ বছর বয়সী কন্যা ফাতেমা এবং পাঁচ মাস বয়সী শিশু ফাহিমাকে রৌমারী থানার মাধ্যমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ওই স্থানে অবস্থান করছিলেন সজিব ও হিমেল। তবে মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে তাদের আর সেখানে দেখা যায়নি।ভুক্তভোগীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে খোলা জায়গায় অবস্থান করায় তারা জ্বর, সর্দি-কাশিসহ নানা শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। সীমান্ত এলাকার কাদা, ঝোপঝাড়, খাল-বিল ও নদীপাড়ঘেঁষা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে তারা কোথাও যেতে বা স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগ করতে পারছেন না।এদিকে মানবিক সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ভুন্দুরচর এলাকার আব্দুল মান্নান, মুলুক চান, রহম আলী ও নাজিম উদ্দিন বলেন, “মানুষ হিসেবে তাদের দুর্ভোগ অত্যন্ত কষ্টদায়ক। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার মানবিক সমাধান করা।”স্থানীয়দের মতে, সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে এভাবে মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তারা মানবিক বিবেচনায় দ্রুত কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। এলাকাবাসীর আশা, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত এ অচলাবস্থার অবসান হবে এবং শূন্যরেখায় আটকে থাকা তিন যুবকের দুর্ভোগের সমাধান হবে।এ বিষয়ে রৌমারী ইজলামারী বিওপির ক্যাম্প কমান্ডার নায়েক সুবেদার দুলাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা