প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬
সিটি গ্রুপের ঋণ সংকটে দক্ষ ব্যাংকারদেরও দায় রয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপকে ঝুঁকি পর্যালোচনা না করে কেবল সুনামের ভিত্তিতে বিপুল অংকের ঋণ দেওয়ায় গ্রুপটির বর্তমান আর্থিক সংকট তৈরিতে দক্ষ ব্যাংকারদেরও দায় রয়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা।বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল শেষে সিটি গ্রুপের মোট ঋণ স্থিতি ছিল ২৪ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, যা দেশী-বিদেশী ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া হয়েছে। ঋণদাতাদের তালিকায় রয়েছে দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি), স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলো, যেগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা দেশের সেরা ব্যাংকার হিসেবে পরিচিত।মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২০২০ সালের পর একসঙ্গে ছয়টি বৃহৎ শিল্প-কারখানা গড়ে তোলে সিটি গ্রুপ, যেখানে বিনিয়োগ করা হয় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। তবে গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত না হওয়ায় এসব কারখানা থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব আসেনি, যা গ্রুপটিকে বর্তমান আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে প্রকৃত বিনিয়োগ সম্ভাবনার বদলে সিটি গ্রুপের নাম দেখেই অনেক ব্যাংক ঋণ দিয়েছে।সিটি গ্রুপের ঋণদাতাদের মধ্যে সর্বাধিক ঋণ রয়েছে এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। এপ্রিল শেষে এইচএসবিসির ঋণ স্থিতি ২ হাজার ২৬২ কোটি টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ২ হাজার ৭২ কোটি টাকা। এছাড়া কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ৪৬৫ কোটি, ব্যাংক আলফালাহর ৮৪ কোটি, হাবিব ব্যাংকের ৩৫ কোটি ও উরি ব্যাংকের ২৯ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) ১১৩ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) ১০১ কোটি ও আইসিডির ৩০৩ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে।দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি গ্রুপে সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে সিটি ব্যাংক পিএলসির, যার পরিমাণ ১ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। এছাড়া ইউসিবির ১ হাজার ৫৭৯ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংকের ১ হাজার ৪০৭ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংকের ১ হাজার ৭০ কোটি, প্রাইম ব্যাংকের ১ হাজার ৩০ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৯৬৪ কোটি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ৯৪৬ কোটি, পূবালী ব্যাংকের ৯১৩ কোটি, ব্যাংক এশিয়ার ৯০৮ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংকের ৮১৮ কোটি, ওয়ান ব্যাংকের ৭৪৩ কোটি, এনসিসি ব্যাংকের ৭৩৩ কোটি, ঢাকা ব্যাংকের ৭০৪ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ৬৯৬ কোটি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৬৪৯ কোটি, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ৬২২ কোটি, ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫৯০ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৪৮৩ কোটি, মেঘনা ব্যাংকের ২৩২ কোটি ও উত্তরা ব্যাংকের ২০৬ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আইডিএলসির ৪৯৪ কোটি, ইডকলের ২৬৮ কোটি ও বিআইএফএফএলের ২১০ কোটি টাকার ঋণ উল্লেখযোগ্য।ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ৫০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সিটি গ্রুপ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নীতিসহায়তা চেয়ে লিখিত আবেদন করে, যেখানে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ শ্রেণীকরণ না করাসহ সাত ধরনের নীতিসহায়তা চাওয়া হয়। আবেদনে সিটি গ্রুপ উল্লেখ করে, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে টানা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো কখনো খেলাপি হয়নি বা ঋণের কিস্তি পরিশোধে বিলম্ব করেনি, কিন্তু গত চার বছরে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের প্রভাবে গ্রুপটি তীব্র আর্থিক ও পরিচালনাগত চাপের মুখে পড়েছে।এর ধারাবাহিকতায় গত ১৮ জুন রাজধানীর একটি হোটেলে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা সিটি গ্রুপের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করেন, যেখানে গ্রুপটির ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া ঋণ পুনর্গঠনে সম্মত হয় দেশি-বিদেশি ৩৬টি ব্যাংক। বৈঠকে ঋণ পুনর্গঠনের জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকেরও এ উদ্যোগে ইতিবাচক সায় রয়েছে বলে জানা গেছে।সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর আরেফিন বণিক বার্তাকে বলেন, সিটি গ্রুপের বর্তমান পরিস্থিতিকে একক প্রতিষ্ঠানের সংকট হিসেবে না দেখে বৃহত্তর করপোরেট ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা উচিত। তিনি জানান, দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে সিটি গ্রুপের সঙ্গে ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং এর সঙ্গে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক টার্নওভার ও ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। মাসরুর আরেফিন আরও বলেন, এতগুলো ব্যাংক একযোগে সিটি গ্রুপকে অর্থায়ন করা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা নয়, বরং দেশে দীর্ঘমেয়াদি করপোরেট অর্থায়নের জন্য পর্যাপ্ত পুঁজিবাজার গড়ে না ওঠায় ব্যাংকগুলোকেই এ ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, এ অভিজ্ঞতা থেকে গ্রুপ এক্সপোজার, নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও আন্তঃব্যাংক সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সহযোগিতায় সংকট সমাধান সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী। তিনি আরও বলেন, বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও সেগুলো থেকে রাজস্ব না আসায় সম্ভাব্য বিপদ তিনি আগে থেকেই অনুমান করতে পেরেছিলেন।ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ব্যাংকগুলোকে অনুমোদিত ঋণনীতি ও বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুসরণ করে প্রতিটি ঋণ প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে হবে, গ্রাহকের অতীত সম্পর্ক বা সুনামের ভিত্তিতে নয়। তিনি বলেন, ঋণগ্রহীতার বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ তৈরির সামর্থ্য, সুশাসনের মান, সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করে ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা নির্ধারণ করা উচিত। একই সঙ্গে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর নিজ নিজ আর্থিক অবস্থান, কার্যক্রমের ফলাফল, সম্ভাব্য দায় ও উদীয়মান ঝুঁকি সম্পর্কে সম
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা