প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬
কাজের সংকটে শিল্পখাতে ধস, ৪৫৭ কারখানার ৮৬ শতাংশ স্থায়ী বন্ধ
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
আর্থিক সংকট ও পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশের অভাবে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোয় ব্যাপক হারে কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শিল্প গোয়েন্দা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের শিল্প অধ্যুষিত সাতটি এলাকায় মোট ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশের অভাবে এবং ১৯০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে মালিকের আর্থিক সংকটে। অর্থাৎ মোট বন্ধ কারখানার ৮৬ দশমিক ৪৩ শতাংশের প্রধান কারণ কাজের অভাব ও আর্থিক সংকট। বাকি কারখানাগুলোর মধ্যে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ১১টি এবং রাজনৈতিক জটিলতা, ব্যাংকিং সংকট, গ্যাস-বিদ্যুৎ ঘাটতি, কাঁচামালের অভাব ও ফ্যাক্টরি স্থানান্তরসহ অন্যান্য কারণে ৫১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে।এ ধরনের সর্বশেষ ঘটনা ঘটেছে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায়। আর্থিক সংকটের কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সেখানকার ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড। শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, গত ১৬ জুন থেকে কারখানাটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় দুই হাজার দুইশ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন এক হাজার সাতশ শ্রমিক। মালিকপক্ষের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও চাকরিসংক্রান্ত সুবিধাসহ সব আইনানুগ পাওনা আগামী ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়েছে।দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোয় মোট কারখানার সংখ্যা ১০ হাজার ২৩৮। এর মধ্যে গাজীপুরে দুই হাজার ৭৬৪ কারখানার মধ্যে বন্ধ হয়েছে ১৫৫টি, যা সাত এলাকার মধ্যে সর্বোচ্চ। আশুলিয়ায় এক হাজার ৭০৫ কারখানার মধ্যে বন্ধ ১২৪টি, চট্টগ্রামে এক হাজার ৭৭৮ কারখানার মধ্যে বন্ধ ১১৯টি এবং নারায়ণগঞ্জে এক হাজার ৯৬০ কারখানার মধ্যে বন্ধ ৩৮টি। এছাড়া ময়মনসিংহে আটটি, খুলনায় ছয়টি এবং কুমিল্লায় সাতটি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। তবে সিলেট অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া কোনো কারখানার তথ্য পাওয়া যায়নি।বন্ধ হওয়া ৪৫৭ কারখানার মধ্যে পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য ১০৮টি এবং বিকেএমইএর সদস্য ৩৫টি। সুতা-কাপড় উৎপাদনকারীদের সংগঠন বিটিএমএর সদস্য আটটি এবং বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) আওতাধীন ১৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। কোনো সংগঠনের বাইরে থাকা কারখানার সংখ্যা ২৮৭। মোট বন্ধ কারখানার একতৃতীয়াংশের বেশি, অর্থাৎ ১৫১টি তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতসংশ্লিষ্ট।ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দিন বলেন, অধিকাংশ কারখানাই শ্রম আইন অনুযায়ী নোটিস দিয়ে কার্যক্রম বন্ধ করছে, তবে মূল সমস্যা হলো শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে বিলম্ব। তিনি জানান, অনেক কারখানা নোটিস দিয়ে বন্ধ করলেও শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য পাওনা ঠিকভাবে পরিশোধ না হওয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হয়। তিনি আরও জানান, মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই উদ্যোগ নিতে হয়।বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, কারখানা বন্ধের বিষয়টি একমাত্রিক নয় এবং বন্ধের কারণগুলোর ক্ষেত্রে ছোটখাটো ব্যত্যয় থাকলেও বেশির ভাগ তথ্য সঠিক। তিনি জানান, সব কারখানা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না; কিছু কারখানা সংকটে আছে এবং কিছু টিকে থাকার লড়াই করছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার মাধ্যমে কিছু কারখানা সচল রাখা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন এবং জানান, তৃতীয় পক্ষের অডিটের মাধ্যমে বন্ধ কারখানার প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলমান।সরকার ইতিমধ্যে বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবিত করতে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। বিজিএমইএ সূত্র অনুযায়ী, ৩২২টি কারখানা এই প্রণোদনা পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে ১৯৯টি সম্পূর্ণ বন্ধ এবং ১২৩টি আংশিক বন্ধ। প্রণোদনা প্রাপ্তির যোগ্যতা যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে।বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, এই সংকট একক কারণে সৃষ্টি হয়নি, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি ও নানামুখী সমস্যার ফল। তিনি জানান, শুরুতে অর্ডার ঘাটতি ছিল, যা পরে কর্মমূলধন সংকটে রূপ নেয়, এবং অনেক কারখানা ঋণপত্র খুলতে না পারায় কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। জ্বালানি সংকট, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং চাপ শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি আরও জানান, বৈশ্বিক সংকট, কভিড মহামারীর অভিঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবও শিল্পখাতে পড়েছে।পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বিপদগ্রস্ত কারখানাগুলোকে সহায়তা করার উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখেন, কারণ সামষ্টিক অর্থনীতি, কভিড-পরবর্তী পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে গত তিন-চার বছরে দেশের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তবে তিনি সতর্ক করেন, ঢালাওভাবে সহায়তা দেওয়া ঠিক হবে না, কারণ বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা কারখানার মেশিনারি ও অবকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি পুনর্গঠন ছাড়া চালু করা সম্ভব নয়। সহায়তার জন্য বাছাই করা কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের অডিট করে প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ের পর রিকভারি রোডম্যাপ তৈরি ও যাচাই করেই সহায়তা দেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।শিল্প খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, উৎপাদন খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেখা যাওয়া উচ্চমাত্রার বন্ধ ও স্থবিরতার পেছনে শুধু আর্থিক দুর্বলতাই নয়, বাজার চাহিদার সংকোচন, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং কাঠামোগত দুর্বলতাও সমানভাবে দায়ী। প্রকৃতভাবে টিকে থাকার সক্ষমতা আছে এমন শিল্পগুলোকে বাছাই করে সহায়তা দেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা