প্রিন্ট এর তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬
জমি অধিগ্রহণে অনিয়ম ও হয়রানি: উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে সাধারণের কান্না
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে বাস্তবায়নাধীন আন্তর্জাতিক মানের 'সাসেক-২ ইন্টারচেঞ্জ' প্রকল্পটি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। কিন্তু উন্নয়নের এই মহাপরিকল্পনা ঘিরে এখন সৃষ্টি হয়েছে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা। প্রকল্পের জন্য জমি দেওয়া শত শত মালিক এখন সরকারি অফিসের বারান্দায় ঘুরছেন তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণের আশায়। অভিযোগ উঠেছে, ভূমি অধিগ্রহণ শাখার এক অসাধু সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।৭৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটির কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো, যেসব জমির ওপর এই দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা দাঁড়িয়েছে, সেই জমির প্রকৃত মালিকদের একটি বড় অংশই এখনও তাদের ক্ষতিপূরণের চেক হাতে পাননি।ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না:ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। বছরের পর বছর ফাইল আটকে রেখে সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষতিপূরণের চেক পেতে জমির মালিকদের ৮ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ঘুষ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।রাধানগর মৌজার ষাটোর্ধ্ব কৃষক সহির উদ্দিনের গল্পটি এই অনিয়মের এক বাস্তব চিত্র। সাসেক-২ প্রকল্পের জন্য তার সাড়ে ২৮ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ২০২০ সাল থেকে চেক পাওয়ার আশায় তিনি ঘুরছেন। সহির উদ্দিনের ভাষ্যমতে, "তিন বছর ঘোরার পর শাখার কানুনগো রকিবর রহমান রকিব ও সার্ভেয়ার মমতাজ উদ্দিন ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। ধারদেনা ও অন্য জমি বিক্রি করে সেই টাকা দেওয়ার পরও এখন বলা হচ্ছে, তালিকায় আমার নাম নেই। আবারও টাকা দিলে তারা সব ঠিক করে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছে।"কর্মকর্তাদের বক্তব্য:এমন ভয়াবহ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জ ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কানুনগো রকিবর রহমান রকিব সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তিনি জানান, নিয়ম মেনেই সব কার্যক্রম চলছে।অন্যদিকে, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অভিযোগের বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নুর নাহার বেগম বলেন, "কেউ জমির মালিকদের হয়রানি করলে বা অনৈতিকভাবে অর্থ দাবি করলে ছাড় দেওয়া হবে না। যথাযথ প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ভূমি অধিগ্রহণ শাখার বিভিন্ন স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, "সিসি ক্যামেরার নজরদারি সত্ত্বেও কেউ যদি দুর্নীতি বা হয়রানির সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।"ম্লান হচ্ছে উন্নয়নের আভা:হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু উন্নয়নের এই অর্জন সাধারণ মানুষের চোখের জলে ম্লান হতে পারে না। ভূক্তভোগী ও সচেতন মহলের মতে, কেবল সিসি ক্যামেরা নয়, প্রয়োজন অসাধু চক্রের মূলোৎপাটন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের দ্রুত প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দেওয়া। সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসনের ওপর এখন তীক্ষ্ণ নজর সাধারণ মানুষের—তারা কি অসাধু সিন্ডিকেট ভাঙতে পারবেন, নাকি উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে এভাবেই চলতে থাকবে সাধারণের হয়রানি?
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা