প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
স্বাধীন দুদক নাকি নিয়ন্ত্রিত সংস্কার: কোন পথে দুর্নীতিবিরোধী লড়াই?
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত দুদক-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানোর পর নতুন করে সংস্কার উদ্যোগের বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে কমিশনের নেতৃত্বশূন্য পরিস্থিতি এবং সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুদকের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে একটি নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তা উপস্থাপিত না হওয়ায় অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারায়। এর ফলে দুদক আবার ২০০৪ সালের মূল আইনি কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।এদিকে গত ৩ মার্চ মোমেন কমিশনের পদত্যাগের পর তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে নতুন কমিশন গঠিত হয়নি। ফলে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম চললেও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে চতুর্থবারের মতো এমন নেতৃত্বশূন্য পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে দুদক।দুদক সংস্কার প্রশ্নটি রাষ্ট্র সংস্কারের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে সামনে আসে। দুর্নীতিবিরোধী কর্মী ও সুশাসনকর্মীদের মতে, দুদকের সংকট শুধু আইনি সীমাবদ্ধতা বা জনবল ঘাটতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের প্রশ্নও জড়িত। তাদের ভাষ্য, ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে দুদকের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে জনআস্থা পুনরুদ্ধার প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গঠিত দুদক সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশনের প্রধান ছিলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। প্রতিবেদনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ৪৭টি সুপারিশ করা হয়।সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া, কমিশনারের সংখ্যা তিন থেকে পাঁচে উন্নীত করা, অন্তত একজন নারী কমিশনার অন্তর্ভুক্ত করা, বিচারিক ও আর্থিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, তদন্ত ও প্রসিকিউশন ইউনিট শক্তিশালী করা, অর্থপাচার ও আন্তর্জাতিক আর্থিক অপরাধ তদন্তে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কমিয়ে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।তবে সংস্কার সুপারিশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জারি করা অধ্যাদেশ নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। আইনজীবী, সাবেক আমলা ও সুশীল সমাজের একটি অংশের অভিযোগ ছিল, কিছু ধারা দুদকের স্বাধীনতা বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব থাকলেও জবাবদিহির কাঠামো যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না।অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারানোর ফলে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরে পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা পুনর্বহাল হয়েছে এবং কমিশনের কিছু প্রত্যক্ষ ক্ষমতাও সীমিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।দুদক সংস্কার নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্বাধীনতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। একদিকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত একটি কার্যকর কমিশনের দাবি রয়েছে, অন্যদিকে শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হচ্ছে।দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদক বর্তমানে একটি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। এটিকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করেই প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকর রূপ দেওয়া সম্ভব।সংশ্লিষ্টদের মতে, দুদকের সমস্যাকে শুধু আইনি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে চলবে না। তদন্তের মানোন্নয়ন, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অর্থপাচার তদন্তে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, আইন পরিবর্তন প্রয়োজন হলেও তদন্ত, প্রসিকিউশন ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় সমন্বিত সংস্কার ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকার নতুন করে সংশোধিত সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে কাজ শুরু করেছে। সম্ভাব্য সংস্কারের মধ্যে কমিশনার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর নতুন পদ্ধতি, অর্থপাচার ও বিদেশে সম্পদ পাচার তদন্তে সক্ষমতা বৃদ্ধি, জটিল আর্থিক অপরাধ অনুসন্ধানে বিশেষায়িত ইউনিট গঠন, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান ও তথ্য বিশ্লেষণ সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের পুনর্গঠন ও দুর্নীতিবিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ও ৩১ দফায় দুর্নীতি প্রতিরোধে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সম্ভাব্য কর্মপরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব পাওয়া গেছে।তবে দুদক-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপিত না হওয়া বা বাতিল হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি বলেও তিনি জানান।সংশ্লিষ্টদের মতে, দুদক সংস্কার এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আইন সংশোধন, রাজনৈতিক মতামত, নাগরিক সমাজের পরামর্শ এবং বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করতে স্বাধীনতা, দক্ষতা, জবাবদিহি এবং জনআস্থার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী দুদক গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: জাকিরুল ইসলাম সান্টু
সম্পাদক ও প্রকাশক: এইচ এম মোনায়েম খান
বার্তা সম্পাদক: গোলাম মোস্তফা রুবেল
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক লাল বার্তা